পছন্দের শীর্ষে জামায়াত, বিএনপিকে ভোট দেওয়ার পক্ষে মত বেশি

‘বাংলাদেশের জাতীয় জরিপ’ শিরোনামে গত সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে একটি জরিপ পরিচালনা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই)। এতে রাজনৈতিক দলকে পছন্দের দিক থেকে শীর্ষে আছে জামায়াতে ইসলামী। তবে জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে জরিপে অংশগ্রহণকারীদের বেশিরভাগই বেছে নিয়েছেন বিএনপিকে।
নিজেদের ওয়েবসাইটে সোমবার এই জরিপের তথ্য প্রকাশ করেছে আইআরআই। এতে রাঙ্গামাটি বাদে ৬৩ জেলায় ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে ৪ হাজার ৯৮৫ জন অংশ নেন। তাদের মধ্যে পুরুষ ২ হাজার ৪১০ ও নারী ২ হাজার ৫৭৫ জন। জরিপের তথ্য সংগ্রহ করা হয় গত ১৩ সেপ্টেম্বর থেকে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত।

জরিপে বিভিন্ন প্রশ্নের মধ্যে একটি ছিল- দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে (৯টির নাম উল্লেখ করে) কোনটিকে আপনি পছন্দ ও অপছন্দ করেন। উত্তরে ২০ শতাংশ অংশগ্রহণকারী মতামত দিয়েছেন তারা জামায়াতে ইসলামীকে খুবই পছন্দ করেন। কিছুটা পছন্দ করেন ৩৩ শতাংশ (মোট ৫৩%)। আর ১৭ শতাংশ অংশগ্রহণকারী দলটিকে খুবই অপছন্দ করেন। বিএনপিকে পছন্দকারী ৫১ শতাংশ। তাদের মধ্যে খুবই পছন্দ করেন ২৩ আর কিছুটা পছন্দকারী ২৮। দলটিকে খুবই অপছন্দ করেন ২২ শতাংশ।
তবে জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে অংশগ্রহণকারীরা বিএনপিকে এগিয়ে রেখেছেন। জরিপে সাধারণ অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বিএনপিকে ভোট দেওয়ার পক্ষে ৩০ শতাংশ। জামায়াতের ক্ষেত্রে এই হার ২৬।
আগামী নির্বাচনে ভোট দিতে চান এমন ৩ হাজার ২৭০ জন অংশগ্রহণকারীকেও ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে দল বাছাই করতে বলা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ৩৩ শতাংশ বলেছেন বিএনপিকে ভোট দেবেন। ২৯ শতাংশ ভোট দিতে চেয়েছেন জামায়াতকে।
অন্য দলগুলোর মধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টিকে (এনসিপি) খুবই পছন্দ করেন ৬%, কিছুটা পছন্দ করেন ৩২ শতাংশ। জরিপে সাধারণ অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে এই দলটিকে ভোট দিতে চান ৬ শতাশ।
আওয়ামী লীগকে খুবই পছন্দ করে ১১ এবং খুবই অপছন্দ করে ৪০%। এছাড়া, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে খুবই পছন্দ করে ৫, জাতীয় পার্টিকে ৪%। অন্য দলগুলোর মধ্যে আমার বাংলাদেশ, গণসংহতি আন্দোলন ও গণঅধিকার পরিষদকে খুবই পছন্দকারী ১ শতাংশ করে। ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে জাতীয় পার্টি ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে বাছাই করেছেন যথাক্রমে ৫ ও ৪ শতাংশ অংশগ্রহণকারী।
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মতামত অনুযায়ী, আগামী নির্বাচন স্বাধীন ও ন্যায্য হওয়ার ব্যাপারে খুবই আশাবাদী ৪৩ শতাংশ আর খুবই হতাশাবাদী ৫ শতাংশ। সমান যোগ্যতার নারী ও পুরুষদের মধ্যে কোন প্রার্থীকে বাছাই করবেন? এমন প্রশ্নে ৬২% পুরুষের পক্ষে। নারীর পক্ষে ১৬%। লিঙ্গীয় পরিচয় কোনো বিষয় নয়- এমনটা মনে করেন জরিপে অংশ নেওয়া ২০ শতাংশ ব্যক্তি।

দেশ সঠিক নাকি ভুল পথে
৫৩ শতাংশ মনে করেন দেশ সঠিক পথে পরিচালিত হচ্ছে। ৪২ শতাংশ মনে করে ভুল পথে যাচ্ছে। ভুল পথে মনে করার ক্ষেত্রে ৩৮% পুরুষ, বিপরীতে ৪৬% নারী। আর সঠিক পথে মনে করার সংখ্যায় পুরুষ ৫৮% ও নারী ৪৮%। ভুল পথে মনে করাদের মধ্যে ৪৭ শতাংশ ৫৬ বছরের বেশি বয়সী। সঠিক পথে মনে করা সবচেয়ে বেশি বরিশালে (৬৪%) আর কম ময়মনসিংহে (৪১%)।
কোন দিক বিবেচনায় সঠিক পথে যাচ্ছে? এমন প্রশ্নের উত্তরে সবচেয়ে বেশি ২০ শতাংশ মনে করেন অর্থনৈতিকভাবে। আইনশৃঙ্খলায় ১৭ শতাংশ। আর শেখ হাসিনার পদত্যাগকে দেশ সঠিক পথে পরিচালিত হওয়ার কারণ মনে করে ৩ শতাংশ। পোশাক খাতের উন্নয়নকে কারণ হিসেবে দেখে ১ শতাংশ অংশগ্রহণকারী।
ভুল পথে পরিচালিত হওয়ার পেছনে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধিকে কারণ মনে করে ২২ শতাংশ। আইন-শৃঙ্খলা ও বিচারব্যবস্থার অবনতিকে কারণ মনে করে ১৮ শতাংশ। অনির্বাচিত সরকারকে কারণ মনে করে ৫, মব জাস্টিস ও নারীর অনিরাপত্তাকে কারণ মনে করে যথাক্রমে ১ শতাংশ করে।
এককভাবে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা কোনটি? এমন প্রশ্নে ২১ শতাংশ অংশগ্রহণকারী দুর্নীতির কথা উল্লেখ করেছেন। চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে দুর্নীতিকে সমস্যা মনে করে ৩০ শতাংশ। এ ছাড়া, রাজনৈতিক অস্থিরতাকে ১৮ এবং ট্রাফিক ব্যবস্থা, বেহাল সড়ক ও গণপরিবহনকে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা মনে করেন মাত্র ২ শতাংশ অংশগ্রহণকারী।
বাংলাদেশের ভবিষ্যত নিয়ে আশাবাদী ৪২ আর হতাশাবাদী ৩৮ শতাংশ। কিছুটা হতাশাবাদীর সংখ্যা ১১ শতাংশ। খুবই হতাশাবাদী ৬%। ভবিষ্যতে ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী ৫৬%। স্থির থাকবে বলে মনে করেন ২৬ শতাংশ।

অন্তর্বর্তী সরকারের কাজ ও প্রধান উপদেষ্টা
অন্তর্বর্তী সরকার খুব ভালো কাজ করছে বলে মনে করেন ২৬ শতাংশ অংশগ্রহণকারী। কিছু ভালো কাজ করছে বলে মত ৪৪ শতাংশের। খুবই খারাপ কাজ করছে মনে করেন ১১ ও কিছুটা খারাপ কাজ করছে মনে করে ১৫ শতাংশ।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস খুবই ভালো কাজ করছেন মনে করেন ২৬ শতাংশ। ৪৩ শতাংশ মনে করেন কিছুটা ভালো কাজ করছেন। ৯ শতাংশ মনে করে খুবই খারাপ কাজ করছেন।
প্রধান উপদেষ্টার কাজকে খুবই ভালো মনে করা ব্যক্তিদের মধ্যে ৩৩% উচ্চশিক্ষিত, ২৭ শতাংশ উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়েছেন। অর্থনৈতিকভাবে স্বাচ্ছন্দ্যে আছেন এমন মানুষের মধ্যে ৩৩ শতাংশ অধ্যাপক ইউনূসের কাজকে খুবই ভালো মনে করেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্ষমতা কোন ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো ও সবচেয়ে খারাপ? এমন প্রশ্নের উত্তরে সবচেয়ে বেশি মতামত পড়েছে সুপেয় পানির প্রাপ্যতায় (৫০%)। এ ছাড়া, বিদ্যুতে ৪২ ও শিক্ষার উন্নয়নে ৩০%। আর সবচেয়ে খারাপ কার্যক্ষমতা হিসেবে ২৮% মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কথা উল্লেখ করেছেন। বেকারত্ব দূরীকরণে সরকারের কার্যক্ষমতা দুর্বল বলে মনে করেন ২৩ শতাংশ।
বিদেশি প্রভাব
কোন দেশগুলো বাংলাদেশের ওপর ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে? এমন প্রশ্নে খুবই ইতিবাচক প্রভাবের ক্ষেত্রে চীনের কথা বলেছেন ২৬ শতাংশ অংশগ্রহণকারী। এরপরে আছে রাশিয়া (২৫%), যুক্তরাষ্ট্র ২৩, পাকিস্তান ১৬ ও ভারত ১১%। খুবই নেতিবাচক প্রভাব ফেলার দিক থেকে ভারতের নাম বলেছেন ৩৩%। যুক্তরাষ্ট্রের নেতিবাচক প্রভাব দেখেন ১৩ শতাংশ অংশগ্রহণকারী।
আরও পড়ুন
- সর্বশেষ খবর
- সর্বাধিক পঠিত
