নতুন ভূমি আইনে যে একটিমাত্র প্রমাণেই নির্ধারিত হবে জমির প্রকৃত মালিক

| আপডেট :  ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৫:৫২  | প্রকাশিত :  ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৫:৫২

 

জমির মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিনের জটিলতা ও সংঘাত নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, একই জমির মালিকানা নিয়ে একাধিক ব্যক্তি দাবি করলে একটি নির্দিষ্ট ও শক্তিশালী প্রমাণের ভিত্তিতেই প্রকৃত মালিক নির্ধারণ করা যাবে। একবার সেই মালিকানা নিশ্চিত হলে, ভোগদখল বা মালিকানা বাতিল করার ক্ষমতা কারও থাকবে না।

দেশজুড়ে প্রায়ই দেখা যায়, একই জমি নিয়ে একাধিক ব্যক্তি দলিল দেখিয়ে মালিকানা দাবি করছেন। অনেক ক্ষেত্রে এসব দ্বন্দ্ব গ্রাম্য সালিশ থেকে শুরু হয়ে আদালত পর্যন্ত গড়ায়, এমনকি সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটে। পরবর্তীতে জমি সংক্রান্ত বিরোধ ফৌজদারি মামলায় রূপ নেয়, যেখানে উভয় পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এই পরিস্থিতি এড়াতে এবং আদালতের বাইরে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে ভূমি সংক্রান্ত কিছু স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

দলিলই প্রথম ধাপ, তবে যাচাই অপরিহার্য

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, একই জমির ক্ষেত্রে একাধিক ব্যক্তি যদি দলিলের মাধ্যমে মালিকানা দাবি করেন, তবে সর্বপ্রথম দেখতে হবে—কার দলিলটি বৈধ ও সঠিক। শুধু দলিল থাকলেই মালিকানা নিশ্চিত হয় না; দলিলটি কোন মালিকের কাছ থেকে, কীভাবে এবং কোন সূত্রে হস্তান্তরিত হয়েছে—সেটি যাচাই করতে হবে।

 

অনেক সময় জাল বা ভুয়া দলিলের মাধ্যমে জমি দখলের চেষ্টা করা হয়। তাই সংশ্লিষ্ট দলিল সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের বালাম বই ও সূচিপত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি। যদি দাগ নম্বর, সিরিয়াল নম্বর বা রেজিস্ট্রির তথ্য বালাম বইয়ের সঙ্গে না মেলে, তবে সেই দলিলকে ভুয়া হিসেবে গণ্য করার সুযোগ রয়েছে।

খতিয়ান: মালিকানা নির্ধারণের মূল চাবিকাঠি

দলিল যাচাইয়ের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হবে খতিয়ান। সিএস, এসএ, আরএস, বিএস বা সিটিজ—সব ধরনের খতিয়ান ভূমি অফিস থেকে সংগ্রহযোগ্য। নীতিগতভাবে যাঁর নামে বৈধ দলিল থাকবে, তাঁর নামেই খতিয়ান সংশোধিত থাকার কথা।

যদি সর্বশেষ দলিলগ্রহীতা খতিয়ান সংশোধন না করে থাকেন, তবে তাঁর দাতার নামে খতিয়ান বা মাঠ পর্চা আছে কি না, সেটি খতিয়ে দেখতে হবে। কারণ মাঠ পর্চা ছাড়া বৈধভাবে জমি হস্তান্তর প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।

মালিকানা চেইনই চূড়ান্ত প্রমাণ

নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যার মালিকানা ধারাবাহিকভাবে রেকর্ডে রয়েছে—অর্থাৎ পূর্বপুরুষ থেকে শুরু করে একের পর এক খতিয়ান সংশোধনের মাধ্যমে মালিকানা হস্তান্তরের একটি সুস্পষ্ট ‘চেইন’ আছে—তিনিই প্রকৃত মালিক হিসেবে বিবেচিত হবেন।

এমনকি কেউ বর্তমানে জমির দখলে না থাকলেও, যদি তাঁর পূর্বপুরুষের নামে রেকর্ডিও খতিয়ান থাকে এবং বৈধভাবে উত্তরাধিকার বা ক্রয় সূত্রে মালিকানা প্রমাণ করা যায়, তাহলে তাঁর দাবি গ্রহণযোগ্য হবে।

অন্যদিকে, যেসব দলিল খতিয়ান বা পূর্ববর্তী মালিকানা চেইনের সঙ্গে সংযুক্ত নয়, সেগুলোর ভিত্তিতে মালিকানা দাবি টেকসই হবে না—খতিয়ান সংশোধন করা হলেও।

সহজ সমাধানের পথে ভূমি বিরোধ

ভূমি বিশেষজ্ঞদের মতে, দলিল যাচাই, খতিয়ান পর্যালোচনা ও মালিকানা চেইন বিশ্লেষণ—এই একটিমাত্র সূত্র অনুসরণ করলেই অধিকাংশ ভূমি বিরোধ সহজেই নিষ্পত্তি করা সম্ভব। এতে আদালতনির্ভরতা কমবে, সহিংসতা হ্রাস পাবে এবং প্রকৃত ভূমি মালিকেরা ন্যায়বিচার পাবেন।

নতুন এই নির্দেশনা কার্যকর হলে, জমির মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা ও দ্বন্দ্ব অনেকটাই কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আরও পড়ুন


  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত