জেলেনস্কিকে যেসব বিষয়ে নিয়ে সমঝোতা করতে বললেন ট্রাম্পের দূত

ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে কিছু বিষয়ে ছাড় দিতে হবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ। রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) কিয়েভে জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি একথা বলেন। তবে জেলেনস্কি জানিয়েছেন, রাশিয়ার দাবি অনুযায়ী ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ কোনো ভূখণ্ড ছেড়ে দেয়ার প্রশ্নই আসে না।
সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ বলছে, ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে আলোচনা আবারও শুরু করার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র। এরই অংশ হিসেবে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সমঝোতার জন্য কিছু বিষয়ে ছাড় দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্টিভ উইটকফ। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত উইটকফ বলেন, ইউক্রেনের সঙ্গে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ‘গুরুত্বপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত কিছু প্রস্তাব’ নিয়ে এসেছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ও ইউরোপের নিরাপত্তাবিষয়ক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি এ কথা বলেন।
এর আগে রোববার কিয়েভের সোফিয়া স্কয়ারে জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক করেন উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার। ঐতিহাসিক সেন্ট সোফিয়া ক্যাথেড্রালের সামনে এবং ইউক্রেনের গোয়েন্দা সংস্থার সদর দপ্তরের বিপরীতে ওই বৈঠক হয়। দুই দিন আগে রুশ ড্রোন হামলায় ওই গোয়েন্দা সদর দপ্তর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
আনুষ্ঠানিক আলোচনা শেষে সংবাদ সম্মেলনে উইটকফ বলেন, ‘দুই পক্ষকেই কিছু বিষয়ে ছাড় দিতে হবে এবং নিজেদের মধ্যকার মতবিরোধ কমিয়ে আনতে হবে। আমরা মনে করি, সেখানে পৌঁছানোর মতো প্রয়োজনীয় উপাদান আমাদের হাতে রয়েছে।’
তবে নতুন কোনো বড় ধরনের সমাধান নিয়ে মার্কিন প্রতিনিধিরা কিয়েভে যাননি। আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্র ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে জানিয়েছে, ফেব্রুয়ারিতে শান্তি আলোচনা থমকে যাওয়ার সময় যেসব পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল, সেগুলোরই হালনাগাদ সংস্করণ নিয়ে তারা এসেছেন। এর আগে শনিবার মস্কোয় পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেন উইটকফ। বৈঠকের পর রুশ প্রেসিডেন্টকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি ‘অবিশ্বাস্য কিছু স্মৃতির’ কথা বলেন।
এদিকে মার্কিন শান্তি আলোচকদের সঙ্গে বৈঠকের পর সংবাদ সম্মেলনে জেলেনস্কি স্পষ্ট করে দেন, পুতিনের দাবি অনুযায়ী ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ কোনো ভূখণ্ড রাশিয়ার হাতে তুলে দেয়া হবে না।
এর আগের আলোচনাগুলোও রাশিয়ার কঠোর দাবির কারণে বারবার ব্যর্থ হয়েছে। এসব দাবির একটি হলো—ইউক্রেনের ডনবাস অঞ্চল রাশিয়ার হাতে তুলে দিতে হবে। যদিও যুদ্ধের ময়দানে এখনো পুরো ডনবাস দখল করতে পারেনি রাশিয়া।
রোববারও জেলেনস্কি এই ছাড় দেয়ার সম্ভাবনা নাকচ করে দেন। তিনি বলেন, বিষয়টি ইউক্রেনের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত। তিনি বলেন, ‘ডনবাসের বিষয়টি শুধু ডনবাসের বিষয় নয়। আমার বিশ্বাস, এটি পুরো যুদ্ধের বিষয়—টিকে থাকার এবং দীর্ঘ লড়াইয়ের ব্যাপার। এই ভূখণ্ডের বিষয়টিই রাশিয়ার মূল লক্ষ্য। বিভিন্ন দিক থেকে এটি ইউক্রেনের একটি প্রতিরক্ষাবলয়ের মতো কাজ করছে।’
রাশিয়ার ওপর আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের একটি বিল যুক্তরাষ্ট্রে পাস হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন জেলেনস্কি। প্রয়াত সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের উদ্যোগে তৈরি ওই বিলে রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলোর ওপর বড় ধরনের শুল্ক আরোপের প্রস্তাব রয়েছে। এর মাধ্যমে রাশিয়ার যুদ্ধ চালানোর সক্ষমতা দুর্বল করার লক্ষ্য নেয়া হয়েছে।
জ্যারেড কুশনার এদিন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের ‘দৃঢ়তার’ প্রশংসা করেন। তবে তিনি বারবার ইঙ্গিত দেন, আলোচনা ব্যর্থও হতে পারে। এমনকি শেষ পর্যন্ত কোনো ‘শান্তি চুক্তির প্যাকেজ’ তৈরি করা সম্ভব হবে কি না, সেটিও তিনি জানেন না বলে জানান।
মার্কিন প্রতিনিধিদের সফরের সময় রাশিয়া ও ইউক্রেন—দুই দেশই পরস্পরের রাজধানীতে তিন দিনের জন্য হামলা বন্ধ রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তবে ইউক্রেনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশটির অন্য এলাকায় রুশ বাহিনীর হামলা অব্যাহত রয়েছে।
ট্রাম্পের সবচেয়ে বিশ্বস্ত আলোচক হিসেবে পরিচিত সাবেক রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী উইটকফ এবারই প্রথম কিয়েভ সফর করলেন। এর আগে তিনি কখনো ইউক্রেনের রাজধানীতে যাননি। তবে তার হিসাবে, তিনি মস্কো সফর করেছেন প্রায় আটবার।
এর আগে আলোচনায় রাশিয়ান পক্ষকে ট্রাম্পকে খুশি করে কীভাবে নিজেদের স্বার্থ আদায় করা যায়, সে বিষয়ে পরামর্শ দিতে উইটকফকে দেখা গেছে। ক্রেমলিনের রেড রুমে পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের সময়ও তিনি একই ধরনের কৌশল অনুসরণ করেছেন বলে মনে হয়েছে।
পুতিনকে তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই ভাবছিলাম, অবসরে যাওয়ার পর আমাদের কাছে এসব অবিশ্বাস্য গল্প আর স্মৃতি থাকবে। আর এসব স্মৃতির মধ্যে আপনার সঙ্গে কাটানো সময় থাকবে একেবারে সবার ওপরে।’
উইটকফ যখন মস্কোয় ছিলেন, তখন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ বলেন, পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে তার দেশ ‘প্রকৃত যুদ্ধের শুরুতে’ রয়েছে। এর আগে বার্লিন অভিযোগ করেছিল, রাশিয়া বিস্ফোরক বহনকারী ড্রোন দিয়ে লাইপজিগ বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে।
লাইপজিগে ব্যর্থ ড্রোন হামলার প্রতিক্রিয়ায় জার্মানি বন শহর থেকে রুশ কনস্যুলেট জেনারেলকে বহিষ্কার করেছে। পাশাপাশি বার্লিনে রুশ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ‘রাশিয়ান হাউস’ও বন্ধ করে দিয়েছে। আগস্টের শুরুতে ওই হামলার বিষয়টি জানা যায়। ইউরোপে রাশিয়ার চালানো সবচেয়ে দুঃসাহসী নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডগুলোর একটি হিসেবে এটিকে বিবেচনা করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন
- সর্বশেষ খবর
- সর্বাধিক পঠিত
