চাঁদাবাজদের তালিকায় নাম সাড়ে ৬ শতাধিক, সবচেয়ে বেশি যে জেলায়

দেশজুড়ে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের তালিকা তৈরি করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। সংস্থাটির ১৫টি ব্যাটালিয়নের তদন্তে উঠে এসেছে সাড়ে ৬ শতাধিক চাঁদাবাজের নাম, যাদের বিরুদ্ধে শিগগিরই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছেন র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী।
তিনি জানান, বিভিন্ন ব্যাটালিয়নের যাচাই–বাছাইয়ে এখন পর্যন্ত সারা দেশে ৬৫০ জনের বেশি চাঁদাবাজের নামের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তবে এটি চূড়ান্ত নয়, যাচাই চলমান থাকায় এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন।
তালিকায় সবচেয়ে বেশি নাম পাওয়া গেছে নারায়ণগঞ্জ অঞ্চল থেকে, যা র্যাব-১১’র আওতাধীন। এ অঞ্চল থেকে মোট ১১০ জন অপরাধীর নাম উঠে এসেছে।
দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সিরাজগঞ্জ, র্যাব-১২ এর অধীনে থাকা এই এলাকা থেকে ৬৩ জন সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজের নাম তালিকায় যুক্ত হয়েছে।
র্যাব কর্মকর্তা বলেন, সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে দ্রুত অভিযানে নামা হবে।
চাঁদাবাজি দমনে দেশজুড়ে বিশেষ অভিযান চালানোর পরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে।
শনিবার (১১ এপ্রিল) দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে গতকাল রাজধানীতে ঘটে যাওয়া একটি চাঁদাবাজির ঘটনা উল্লেখ করেন এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী। তিনি জানান, রাজধানীর কল্যাণপুরে সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি (সিকেডি) হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলামের কাছ থেকে চাঁদা দাবির অভিযোগ পাওয়া যায়। মো. মঈন উদ্দিন মঈন নামে স্থানীয় এক ‘যুবদল নেতা’ তার কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা দাবি করেন। তিনি হাসপাতালের স্টাফদের হুমকিও দেন।
জানা গেছে, জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকেই নানাভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে সিকেডি হাসপাতাল থেকে চাঁদা দাবি করে আসছিলেন মইন। ডা. কামরুল ইসলামকে ‘আওয়ামী লীগ’ ট্যাগ দিয়ে হাসপাতালের সামনে মব তৈরিরও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এ বিষয়ে অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলামের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, মইন যুবদলের নেতা ও নিজেকে ‘কমিশনার প্রার্থী’ দাবি করে হাসপাতালের স্টাফদের বিভিন্ন ধরনের হুমকিমূলক কথা বলেন। একইসঙ্গে তাকে ৫ লাখ টাকা দিতে হবে বলেও জানান। মইন ৫ আগস্টের আগে হাসপাতালে যাতায়াত করতেন। সিকেডির স্টাফরা তাকে অনেক সহায়তাও করেছেন। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পরপরই মইন ভিন্ন রূপ ধারণ করেন। নিজেকে বড় নেতা বলে পরিচয় দেন। তিনি গতদিন হাসপাতালে এসে ফোন করে শতাধিক লোক জড়ো করেন। এরপর বলে হাসপাতালে নাকি আওয়ামী লীগের লোকজন চাকরি করেন। বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে সিনক্রিয়েট করেন।
এদিকে, সিকেডি হাসপাতালের ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে নড়েচড়ে বসেন যুবদলের কেন্দ্রীয় নেতারা। তারা ঘটনার পরপরই ডা. কামরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং চাঁদাবাজ চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। তারা এও জানান চাঁদাবাজি করতে হাসপাতালে যাওয়া মইন যুবদলের কেউ নন।
এ ব্যাপারে এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, বিষয়টি পুলিশের কাছে গেছে; যাচাই-বাছাই চলছে। একইসঙ্গে র্যাবও ছায়া তদন্ত শুরু করেছে। অভিযোগ প্রমাণ হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চট্টগ্রামে সাম্প্রতিক একটি বড় ইয়াবা চালান আটকের প্রসঙ্গেও কথা বলেন তিনি। র্যাবের এই কর্মকর্তা জানান, মাঠ পর্যায়ে যারা ধরা পড়ে তারা সাধারণত নিম্নস্তরের সদস্য। তবে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মূল হোতা বা গডফাদারদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালানো হয়। একদিনে সব হয় না, কিন্তু আমাদের চেষ্টা চলমান থাকে।
অতীত কয়েকটি ঘটনা
অতীতে রাজধানী ও এর বাইরে বিভিন্ন সময় চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটে। কয়েকটি ঘটনায় হত্যাকাণ্ডও সংঘটিত হয়। এসব ঘটনার একটি- স্বেচ্ছাসেবক দল ঢাকা উত্তর সিটি ইউনিটের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মুছাব্বির হত্যাকাণ্ড। গত ৭ জানুয়ারি কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউয়ের পাশের একটি গলিতে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার পরদিন তার স্ত্রী তেজগাঁও থানায় চার থেকে পাঁচজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। চাঁদাবাজির ঘটনায় এ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করছে গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)।
জানা গেছে, কারওয়ান বাজার এলাকায় প্রকাশ্যে ও গোপনে চাঁদা আদায়ের সঙ্গে জড়িত আট থেকে নয়টি সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। চাঁদার টাকা নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে ওই এলাকার আধিপত্য ধরে রাখতে মুছাব্বির হত্যার নির্দেশ দেয় দিলীপ ওরফে বিনাশ নামে এক সন্ত্রাসী। চাঁদাবাজদের এসব সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে গোয়েন্দা পুলিশ কাজ করছে বলে নিশ্চিত করেছেন ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ও ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম।
তিনি এও জানিয়েছে, মুছাব্বির হত্যায় জড়িতদের ধরতে ধারাবাহিক অভিযান চলে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গত ১১ জানুয়ারি জিন্নাত (২৪), আবদুল কাদির (২৮), মো. রিয়াজ (৩১) ও মো. বিলালকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ। পরে নরসিংদী থেকে কথিত শুটার রহিমকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ নিয়ে মোট পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের চাঁদাবাজ হিসেবেই চিহ্নিত করা হয়েছে।
এর আগে রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায় ‘সম্রাট’ নামে পরিচিত এক চাঁদাবাজ গণপিটুনিতে নিহত হন। গত বছর ২৪ ডিসেম্বর গভীর রাতে উপজেলার হোসেনডাঙা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সম্রাট দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় চাঁদাবাজিসহ নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিল। তবে পুলিশ জানিয়েছে, সম্রাটের প্রকৃত নাম অমৃত মণ্ডল।
ঘটনার দিন চাঁদাবাজির উদ্দেশ্যে হোসেনডাঙা গ্রামে গেলে স্থানীয়দের হাতে ধরা পড়েন সম্রাট। পরে উত্তেজিত জনতার গণপিটুনিতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত চলমান।
গত বছরের নভেম্বরে খুন হন পল্লবী থানা যুবদলের সদস্যসচিব কিবরিয়া (৪৭)। মিরপুর–১২ নম্বরের বি ব্লকের ‘বিক্রমপুর হার্ডওয়্যার অ্যান্ড স্যানিটারি’ নামে একটি দোকানে ঢুকে খুব কাছ থেকে গুলি করে তাকে হত্যা করে মুখোশধারী তিন সন্ত্রাসী। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদার টাকা লেনদেন নিয়ে দ্বন্দ্ব থেকে ভাড়াটে সন্ত্রাসীদের দিয়ে কিবরিয়াকে হত্যা করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। রাজধানী থেকে জেলা শহর, এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও একই ধরনের চাঁদাবাজির অভিযোগ ক্রমেই বাড়ছে। ব্যবসায়ী, ঠিকাদার, পরিবহন মালিক; কেউই এই চক্রের বাইরে থাকছেন না। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা দুর্বৃত্তরা নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনে আতঙ্ক তৈরি করছে।
বিশেষ করে নির্মাণ খাত, বাজার এলাকা এবং পরিবহন সেক্টরকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজির প্রবণতা বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কোনো কোনো এলাকায় দোকান খুলতে, ব্যবসা চালাতে কিংবা পণ্য পরিবহন করতে গেলেও নির্দিষ্ট হারে চাঁদা দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। অস্বীকৃতি জানালে হুমকি, হামলা, এমনকি হত্যার ঘটনাও ঘটছে। এসবে যারা জড়িত, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। তবে বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা ভয়ে মুখ খুলতে চান না। ফলে অপরাধীরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
চাঁদাবাজি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য
গত ১ মার্চ সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে শীর্ষ সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের আইনের আওতায় আনতে খুব দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশে যত শীর্ষ সন্ত্রাসী আছে, যত চাঁদাবাজ আছে তাদের আইনের আওতায় আনতে খুব দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত করা গেছে, আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।
তবে কি ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেই পরিকল্পনার বিষয়ে তখনই কিছু জানাতে চাননি তিনি। মন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে আমরা অত্যন্ত কঠোর। আমি পরিকল্পনা এখনই ফাঁস করতে পারব না। কিন্তু আমরা কোনো কিছুই বাদ রাখব না এদের আইনের আওতায় আনতে। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ধরতে দেশের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা কাজ করছে এবং সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বিএনপির নামে চাঁদাবাজি হচ্ছে, এ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের উত্তরে সালাহউদ্দিন আহমদ সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার ব্যাপারে জোর দেন।
চাঁদাবাজের তালিকা তৈরির প্রেক্ষাপট
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের ওই বক্তব্যের পর র্যাবের করা সন্ত্রাসীদের নামের তালিকার বিষয়টি শনিবার সামনে আসে। র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক নিজেও সেই ইঙ্গিত দেন। তিনি জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে চাঁদাবাজদের একটি ‘আনবায়াসড’ তালিকা তৈরি করার পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। যারাই তালিকায় থাকবে, তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। যত দ্রুত সম্ভব কাজ শেষ করে মাঠে অভিযান শুরু করা হবে। সেটি আজকেও হতে পারে। চাঁদাবাজি শুধু একটি নির্দিষ্ট খাতে সীমাবদ্ধ নয়। পরিবহন খাতে মহাসড়ক কেন্দ্রিক চাঁদাবাজি, বাজারে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাপ সৃষ্টি, সব ধরনের চাঁদাবাজিকে এ তালিকার আওতায় আনা হচ্ছে। ছোট থেকে বড় সর্বস্তরের অপরাধীকেই বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
তালিকা তৈরির প্রসঙ্গে র্যাব বলছে, অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা ভয় বা নিরাপত্তাজনিত কারণে অভিযোগ করেন না। সেক্ষেত্রে গোয়েন্দা তথ্য, মাঠ পর্যায়ের অনুসন্ধান এবং বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্য যাচাই-বাছাই করে তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। তাছাড়া র্যাব এখন স্বাধীনভাবেই কাজ করছে এবং কোনো ধরনের বে-আইনি চাপ নেই। কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। অপরাধী যেই হোক তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।
আরও পড়ুন
- সর্বশেষ খবর
- সর্বাধিক পঠিত
