যুক্তরাজ্যে আশ্রয়ের জন্য সমকামী সাজছেন বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের অভিবাসীরা

| আপডেট :  ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:০৫  | প্রকাশিত :  ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:০৫

যুক্তরাজ্যে আশ্রয় বা বসবাসের অনুমতি পেতে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের অভিবাসীরা ভুয়া সমকামী সাজছেন। সমকামী সাজতে অভিবাসীদের সহায়তা করছে এক শ্রেণির অসাধু ‘ল ফার্ম’ বা আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান।

মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে এই আইনি পরামর্শকরা অভিবাসীদের সমকামী হওয়ার বানোয়াট গল্প তৈরি এবং জাল তথ্য-প্রমাণ জোগাড় করে দিচ্ছে বলে বিবিসি-র এক আন্ডারকভার (ছদ্মবেশী) অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে।

গত মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) প্রকাশিত এই অনুসন্ধানে দেখা গেছে, যেসব অভিবাসীর ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে, তাদেরকেই এই জালিয়াতির টোপ দেওয়া হচ্ছে। এদের একটি বড় অংশই হচ্ছে, বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি।

সমকামী হিসেবে নিজ দেশে ফিরলে প্রাণনাশের ঝুঁকি আছে, এমন মিথ্যা দাবি তুলে যুক্তরাজ্যে আশ্রয়ের আবেদন করানো হচ্ছে তাদেরকে দিয়ে।
বিবিসি-র এই অনুসন্ধানের প্রতিক্রিয়ায় ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ‘যারা আশ্রয়দান ব্যবস্থার অপব্যবহারের চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং যুক্তরাজ্য থেকে বহিষ্কারসহ সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

নিজ দেশে ফিরে গেলে যারা বিপদে পড়তে পারে, তাদের বসবাসের অনুমতির ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের আশ্রয়প্রক্রিয়া অনেকটাই সুরক্ষা দেয়। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অভিবাসীদের কাছে থেকে মোটা অঙ্কের ফি নেওয়া ল ফার্মগুলো এই সুরক্ষা প্রক্রিয়ার অপব্যবহার করছে।

ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে আসা বহু অভিবাসীর কাছ থেকে অর্থ নিয়ে তাদের শেখানো হচ্ছে কিভাবে সাক্ষাৎকারে কথা বলতে হবে, এমনকি নকল প্রমাণ হিসেবে ছবি, সুপারিশপত্র ও চিকিৎসা নথিও তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে।

এ ক্ষেত্রে বিশেষ করে টার্গেট করা হচ্ছে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মতো দেশের অভিবাসীদেরকে। কারণ, এসব দেশে সমকামিতার মতো বিষয় আইনত নিষিদ্ধ। জালিয়াতির

অনুসন্ধানে দেখা যায়, একটি ল ফার্ম ভুয়া আশ্রয়ের আবেদনের জন্য ৭ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত দাবি করেছে। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, এভাবে আবেদন করলে হোম অফিস থেকে আবেদন বাতিলের ঝুঁকি ‘খুবই কম’। একজন ইমিগ্রেশন কনসালট্যান্ট দাবি করেছেন, তিনি গত ১৭ বছর ধরে এমন জাল আবেদন করতে সহায়তা করছেন।

এমনকি ক্লায়েন্টের সঙ্গে সমকামী শারীরিক সম্পর্ক ছিল, এমন দাবি করার জন্য ভুয়া ব্যক্তিও জোগাড় করে দেয়ার প্রস্তাব দেন তিনি। আশ্রয়প্রার্থীরা চিকিৎসকদের কাছে গিয়ে বিষণ্ণতার অভিনয় করছেন এবং এমনকি কেউ কেউ এইচআইভি পজিটিভ বলেও মিথ্যা তথ্য দিচ্ছেন যাতে তাদের আশ্রয়ের আবেদন শক্তিশালী হয়।

পাকিস্তানি পরিচয় দেয়া ছদ্মবেশী বিবিসি সাংবাদিককে বলা হয়, তিনি নিজে সমকামী হিসেবে আশ্রয় পাওয়ার পর পাকিস্তান থেকে তার স্ত্রীকে নিয়ে আসতে পারবেন। সেক্ষেত্রে তার স্ত্রীকে ‘লেসবিয়ান’ সাজিয়ে ভুয়া আশ্রয়ের আবেদন করানো হবে।

পূর্ব লন্ডনের বেকটনের একটি কমিউনিটি সেন্টারে ‘ওরচেস্টার এলজিবিটি’ নামক একটি সংগঠনের আয়োজিত অনুষ্ঠানে ১৭৫ জনেরও বেশি মানুষ জড়ো হন। সংস্থাটি নিজেদের সমকামী ও লেসবিয়ান আশ্রয়প্রার্থীদের সহায়তা গোষ্ঠী হিসেবে পরিচয় দেয়। সংগঠনটির ওয়েবসাইটে লেখা আছে, তারা কেবল প্রকৃত সমকামী আশ্রয়প্রার্থীদের সহায়তা করে থাকে।

কিন্তু পূর্ব লন্ডনের ওই অনুষ্ঠানের বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। অংশগ্রহণকারী পুরুষদের একজন ছদ্মবেশী সাংবাদিককে জানান, সেখানে প্রকৃত সমকামী প্রায় কেউ নেই। ফাহার নামের এই ব্যক্তি বলেন, ‘এখানে যারা আছে তাদের অধিকাংশই সমকামী নয়।’

গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষদিকে বিবিসি’র ছদ্মবেশী সাংবাদিকরা অনুসন্ধানে নামেন। অনুসন্ধানে তানিসা খান নামের এক পরামর্শদাতার নাম উঠে এসেছে। তানিসার সঙ্গে আলাপের সময় ছদ্মবেশী সাংবাদিক উর্দুতে কথা বলেন। এতে আশ্রয় প্রক্রিয়ায় সহায়তা করতে তানিসা বেশ আগ্রহী হয়ে ওঠেন।

সাংবাদিক যখন জানান তিনি আসলে সমকামী নন, তখন তানিসা সাংবাদিককে বলেন, ‘আমার কথা শুনুন, এখানে কেউ আসল (সমকামী) নন। এখন এখানে টিকে থাকার একমাত্র পথ এটিই এবং সবাই এই পদ্ধতিই গ্রহণ করছে।’

তানিসা আরও জানান, কোনও পরীক্ষা করে কেউ সমকামী কি না তা নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ নেই। সব কিছুই নির্ভর করে সাক্ষাৎকারে কী বলা হচ্ছে তার ওপর।

তিনি ভুয়া ক্লাবে যাওয়ার ছবি, ভুয়া চিঠি এবং যৌন সম্পর্কের প্রমাণপত্রসহ একটি ‘কম্প্রেহেনসিভ প্যাকেজ’ তৈরি করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। এর বিনিময়ে তিনি প্রাথমিকভাবে ২ হাজার ৫০০ পাউন্ড দাবি করেন। এই ঘটনার ভিডিও ফুটেজ দেখানো হয় ৩০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন অভিবাসন বিষয়ক আইনজীবী আনা গঞ্জালেজকে।

ফুটেজ দেখে তিনি বলেন, এটি স্পষ্ট জালিয়াতি। এই ধরনের মানুষরা মূলত প্রকৃত শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীদের জীবন আরও কঠিন করে তুলছে।

বিবিসির অনুসন্ধানে চাঞ্চল্যকর তথ্য

আরও পড়ুন


  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত