প্রত্যাশার চেয়েও যেভাবে দ্রুত পুনর্গঠন হচ্ছে ইরান

প্রায় ৪০ দিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর শুরু হওয়া যুদ্ধবিরতির মাত্র ছয় সপ্তাহের মধ্যেই আবারও ড্রোন উৎপাদন শুরু করেছে ইরান। শুধু তাই নয়, ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, লঞ্চারসহ গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র ব্যবস্থা পুনর্গঠনে পুরো দমে কাজ করছে।
যা তাদের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ধারণার থেকেও বহু গুণে এগিয়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের বরাতে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক সক্ষমতা প্রত্যাশার তুলনায় অনেক দ্রুত পুনর্গঠন করছে। ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, লঞ্চার এবং গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র ব্যবস্থার উৎপাদন সক্ষমতা পুনর্নির্মাণে কাজ করছে ইরান।
ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন তুলনামূলক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ড্রোন সক্ষমতা বাড়িয়ে ইরান ভবিষ্যতে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর বিরুদ্ধে হামলার সক্ষমতা ধরে রাখতে পারে।
এ বিষয়ে মার্কিন এক কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যে সময়সীমা অনুমান করেছিল, ইরান তার চেয়েও দ্রুত পুনর্গঠন করছে। ফলে মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই পূর্ণমাত্রার ড্রোন হামলা সক্ষমতা পুনরুদ্ধার করতে পারে ইরান।
রাশিয়া ও চীনের সহায়তা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের প্রত্যাশার তুলনায় কম ক্ষয়ক্ষতির কারণে ইরান দ্রুত পুনর্গঠন করতে সক্ষম হয়েছে। প্রতিবেদনে দুটি সূত্র জানিয়েছে, সংঘাত চলাকালে চীন ইরানকে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপাদান সরবরাহ অব্যাহত রেখেছিল।
যদিও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান অবরোধের কারণে তা এখন সীমিত হয়ে থাকতে পারে।
তবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, এসব দাবি ‘তথ্যভিত্তিক নয়’।
সাম্প্রতিক মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যে জানা গেছে, ব্যাপক হামলার পরও ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন হামলা এবং আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি। ফলে সামরিক উৎপাদন পুনর্গঠনের কাজ একেবারে শূন্য থেকে শুরু করতে হচ্ছে না।
এদিকে মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি আবার হামলা শুরু করেন, তাহলে ইরান এখনো আঞ্চলিক মিত্রদের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে থাকতে পারে।
ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছিলেন, ইরান শান্তি চুক্তিতে সম্মত না হলে ওয়াশিংটন আরো হামলা চালাতে প্রস্তুত রয়েছে। তবে তিনি ইঙ্গিত দেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘সঠিক উত্তর’ পাওয়ার জন্য আরও কয়েকদিন অপেক্ষা করতে পারে।
ট্রাম্পের হুঁশিয়ারির পর ইরান সতর্ক করে বলেছে, নতুন কোনো হামলা হলে তারা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি থাকা দেশগুলোতে পাল্টা আঘাত হানবে। বুধবার ইরান স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে, এবার তারা আরো দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুকেও নিশানা করতে পারে।
সিএনএনকে দেওয়া এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পারনেল বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর কাছে নিজেদের জনগণ ও স্বার্থ রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সক্ষমতা এবং অস্ত্রভাণ্ডার রয়েছে। ফলে বিভিন্ন অঞ্চলে একাধিক সফল সামরিক অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিরক্ষা সক্ষমতাও অক্ষুণ্ন রেখেছে।
তবে একই সময়ে মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। সেখানে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পরও ইরানের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার অক্ষত রয়েছে। এর আগে গত এপ্রিল মাসে এ সংখ্যা প্রায় অর্ধেক বলে ধারণা করা হয়েছিল। তবে চলমান যুদ্ধবিরতির সুযোগে ইরান ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া কিছু লঞ্চার উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে।
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ইরানের হাজার হাজার ড্রোন এখনো সক্রিয় রয়েছে। যা দেশটির মোট ড্রোন সক্ষমতার প্রায় ৫০ শতাংশ।
একই সঙ্গে ইরানের উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের বড় অংশও অক্ষত রয়েছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়।
সাম্প্রতিক মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে যুদ্ধ ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে দুর্বল করেছে ঠিকই, তবে পুরোপুরি ধ্বংস করতে পারেনি। বরং ইরান দ্রুত পুনর্গঠনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি সীমিত করার সক্ষমতা দেখাচ্ছে।
এদিকে গত মঙ্গলবার মার্কিন কংগ্রেসের হাউস আর্মড সার্ভিসেস কমিটির শুনানিতে সেন্টকম প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার দাবি করেন, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতাকে বড় ধরনের ক্ষতি করেছে এবং দেশটির প্রতিরক্ষা সক্ষমতার প্রায় ৯০ শতাংশ ধ্বংস করেছে। এর ফলে ইরানের পুনর্গঠনে ‘বছরের পর বছর’ সময় লাগবে।
তবে সাম্প্রতিক মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যের সঙ্গে কুপারের বক্তব্যের স্পষ্ট অমিল রয়েছে বলে জানিয়েছে সিএনএন। গোয়েন্দা তথ্যের সঙ্গে জড়িত দুটি সূত্র বলেছে, ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ক্ষতি পুনর্গঠনের সময়সীমা কয়েক বছর নয়, বরং কয়েক মাস পিছিয়ে দিতে পারে। এছাড়া দেশটির কিছু প্রতিরক্ষা অবকাঠামো এখনও অক্ষত রয়েছে, যা পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে আরো দ্রুত করতে পারে।
সব মিলিয়ে যুদ্ধবিরতির মধ্যেও ইরানের সামরিক পুনর্গঠন আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে এবং ওয়াশিংটন-তেহরান সম্পর্ককে নতুন করে সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
আরও পড়ুন
- সর্বশেষ খবর
- সর্বাধিক পঠিত
