লজ্জাজনক পরাজয়ে ফাইনালের স্বপ্নে বড় ধাক্কা বাংলাদেশের

সাম্প্রতিক সময়ে টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক ছিল স্পোর্টিং উইকেটে খেলার মানসিকতা। ঘরের মাঠ কিংবা বিদেশের মাটিতে; ব্যাট ও বলের লড়াই হয় এমন উইকেটে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিচ্ছিল বাংলাদেশ।
চলতি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপেও ভালো পারফরম্যান্সে ফাইনাল খেলার স্বপ্ন দেখছিল দলটি। সেই স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ঘরের মাঠের দুই টেস্টেই জয় ছিল ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু মিরপুরে হুট করে বানানো স্পিন নির্ভর উইকেটে ৮ উইকেটের হতাশাজনক হার সেই সম্ভাবনায় বড় ধাক্কা দিল।
পুরো চারদিনে ঢাকা টেস্টে বাংলাদেশের ব্যর্থতার জায়গাগুলো ছিল স্পষ্ট।
বিশেষ করে স্পিননির্ভর উইকেটে ক্যারিবীয় স্পিনাররা যেভাবে রাজত্ব করেছেন, তার ধারেকাছেও যেতে পারেননি বাংলাদেশের বোলাররা। অন্যদিকে ব্যাটিংয়েও ধারাবাহিকতার অভাব ছিল প্রকট।
সবকিছু ছাপিয়ে সবচেয়ে বেশি ভুগিয়েছে মুশফিকুর রহিমের অনুপস্থিতি। মিডল অর্ডারে তার অভিজ্ঞতা ও চাপ সামলে খেলার সামর্থ্যের অভাব পুরো ম্যাচেই অনুভব হয়েছে।
প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ ২৭২ রান করেছিল মূলত সাদমান ইসলামের ১০৫ রানের ইনিংসে ভর করে। তাওহীদ হৃদয় ৪২ এবং লিটন দাস অপরাজিত ৩৪ রান করেন। একটা সময় ৩ উইকেটে ২১৩ রান ছিল বাংলাদেশের। সেখান থেকে বাকি ৭ উইকেট হারিয়ে মাত্র ৫৯ রান যোগ করতে পারে স্বাগতিকরা। ক্যারিবীয় বাঁহাতি স্পিনার জোমেল ওয়ারিকান একাই নেন ৫ উইকেট। জোশুয়া বিশপের শিকার দুটি।
জবাবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ২৪৫ রানে অলআউট হলে ২৭ রানের লিড পেয়েছিল বাংলাদেশ। জন ক্যাম্পবেল ৫৪, তেজনারায়ণ চন্দরপল ৫৬ এবং জাস্টিন গ্রিভস ৪৬ রান করেন। বাংলাদেশের হয়ে নাঈম হাসান ৩৩ রানে ৪ উইকেট নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ নেন দুটি করে উইকেট। প্রথম ইনিংসে বোলারদের পারফরম্যান্স খুব একটা খারাপ না হলেও দ্বিতীয় ইনিংসে সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেননি তারা।
বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংসের ব্যাটিং বিপর্যয়ই মূলত ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। মাত্র ৩৫ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে কার্যত ম্যাচ থেকে ছিটকে পড়ে স্বাগতিকরা। পরে ৮৪ রানে ৭ উইকেট হারায় দল। শেষ পর্যন্ত নাঈম হাসানের ৯১ বলে ৫২ রানের লড়াকু ইনিংসে ১৪২ রান পর্যন্ত যেতে পারে বাংলাদেশ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের অধিনায়ক রোস্টন চেজ ৩৬ রানে ৫ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের মেরুদণ্ড ভেঙে দেন। ওয়ারিকান নেন ৪ উইকেট।
ক্যারিবিয়দের বিপক্ষে ঢাকা টেস্টে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় তাওহীদ হৃদয়ের ব্যাটিং। প্রথম ইনিংসে ৮৬ বলে ৪২ রান করে নিজের সামর্থ্যের কিছুটা প্রমাণ দিলেও আউট হয়েছিলেন দৃষ্টকটু এক শটে। দ্বিতীয় ইনিংসেতো আরও দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছেন তাওহীদ।বাংলাদেশ তখন ২৮ রানে ২ উইকেট হারিয়ে চাপে। ক্রিজে এসে মাত্র দুই বল খেলেই ফিরে যান তিনি। চেজের বল মিড অনের ওপর দিয়ে তুলে মারতে গিয়ে জেডেন সিলসের হাতে ক্যাচ দেন তিনি। বড় শট খেলার চেষ্টায় পরিস্থিতি বিবেচনার অভাব আবারও সামনে চলে আসে।
প্রথম ইনিংসেও দিনের শুরুতে নিজের দ্বিতীয় বলেই জোমেল ওয়ারিকানের আর্ম বল বুঝতে না পেরে উইকেট ছেড়ে বেরিয়ে এসে বড় শট খেলতে গিয়ে বোল্ড হয়েছিলেন হৃদয়। তখন বাংলাদেশ ৩ উইকেটে ২১৩ রান নিয়ে ভালো অবস্থানে ছিল। সাদমানের বিদায়ের পর তার কাছ থেকে প্রয়োজন ছিল লিটনের সঙ্গে জুটি গড়ে ইনিংস এগিয়ে নেওয়া। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি তিনি। দুই ইনিংসেই তার আউটের ধরন টেস্ট ক্রিকেটে শট নির্বাচন, ধৈর্য ও পরিস্থিতি বুঝে খেলার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
অথচ লাল বলের ক্রিকেটে হৃদয়ের সামর্থ্য নিয়ে আশার জায়গা ছিল। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেক সুখকর না হলেও দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’ দলের বিপক্ষে পচেফস্ট্রুমে অপরাজিত ৩৫০ রানের ইনিংস তাকে নতুন করে আলোচনায় এনেছিল। মিরপুর টেস্টের প্রথম ইনিংসেও ৪২ রান করে সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেন। কিন্তু দুই ইনিংস মিলিয়ে তার ব্যাটিংয়ের ধরন বুঝিয়ে দিয়েছে, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে বড় ইনিংস খেলা আর আন্তর্জাতিক টেস্টে চাপের মধ্যে দায়িত্ব নিয়ে ব্যাটিং করা এক বিষয় নয়।
মুশফিকুর রহিমের সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে হৃদয়ের নাম আলোচনায় আসতেই পারে। কিন্তু এই ম্যাচের পর প্রশ্ন উঠেছে, তিনি কি সত্যিই সেই দায়িত্ব নেওয়ার জন্য প্রস্তুত?
মিরপুর টেস্টে মুশফিকের অনুপস্থিতি যে কতটা বড় হয়ে উঠেছে, বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের দিকে তাকালেই তা বোঝা যায়। অভিজ্ঞ এই ব্যাটার মিডল অর্ডারে থাকলে চাপের মুহূর্তে ইনিংস ধরে রাখার পাশাপাশি অন্যদেরও আত্মবিশ্বাস জোগাতে পারতেন। তার চোটের কারণে পাওয়া সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি তাওহীদ। তার ওপর তৃতীয় দিনে ফিল্ডিংয়ের সময় মাথায় আঘাত পেয়ে কনকাশনে ছিটকে যান মুমিনুল হক। তার বদলি হিসেবে কনকাশন সাব হয়ে খেলতে নামেন জাকের আলী। দ্বিতীয় ইনিংসে মুমিনুলের অনুপস্থিতিও বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে আসে।
অন্যদিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্পিনাররা দুই ইনিংসেই নিজেদের কার্যকারিতা দেখিয়েছেন। ওয়ারিকান প্রথম ইনিংসে ৫ উইকেট নেওয়ার পর দ্বিতীয় ইনিংসেও নেন ৪টি। অধিনায়ক চেজ দ্বিতীয় ইনিংসে ৫ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা হওয়ার দাবিদার হয়ে ওঠেন। জোশুয়া বিশপও প্রথম ইনিংসে গুরুত্বপূর্ণ দুটি উইকেট নেন। বিপরীতে বাংলাদেশের স্পিনাররা প্রথম ইনিংসে ভালো করলেও ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রতিপক্ষের ব্যাটারদের ওপর চাপ তৈরি করতে পারেননি। দ্বিতীয় ইনিংসে ১৭০ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ওপেনারদের থামাতেও ব্যর্থ হন তারা।
চতুর্থ ইনিংসে ১৭০ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে জন ক্যাম্পবেল ও ব্র্যান্ডন কিংয়ের উদ্বোধনী জুটিতে আসে ১১২ রান। ক্যাম্পবেল ৪৯ রানে ফিরলেও কিং অপরাজিত ৮১ রান করে দলকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেন। কাভেম হজ ২৭ বলে ৩১ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেন। ৩৫.১ ওভারে ২ উইকেট হারিয়েই জয় নিশ্চিত করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
স্পোর্টিং উইকেটে নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণ করে এগিয়ে যাওয়ার যে চেষ্টা বাংলাদেশ করছিল, মিরপুরে ফের স্পিন উইকেট বানিয়ে যেন পেছনের পথে হাঁটল বাংলাদেশ। তাও গুরুত্বপূর্ণ টেস্ট সিরিজ। যে সিরিজের মাধ্যমে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের ফাইনাল খেলাটা নির্ভর করছিল। এখন কঠিন সমীকরণের সামনে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। সেই সমীকরণ মেলাতে পারলেই কেবল সম্ভব হবে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল খেলা!
আরও পড়ুন
- সর্বশেষ খবর
- সর্বাধিক পঠিত
