পররাষ্ট্রনীতিতে সাফল্য অধরা, মধ্যবর্তী নির্বাচনের মুখে চাপে ট্রাম্প

ইরান যুদ্ধে বিপুল ব্যয় করেও এক নিয়ে অচলাবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র। এদিকে ইউক্রেন থেকে শুরু করে গাজা পর্যন্ত বিভিন্ন যুদ্ধের সংকটগুলো এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। এই অবস্থায়, আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মুখে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উচ্চাকাঙ্ক্ষী পররাষ্ট্রনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে বলেই মনে হচ্ছে।
গত বছর “শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী” (পিসমেকার) হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে পুনরায় ক্ষমতায় আসা এবং নিজের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রধান এজেন্ডা হিসেবে আন্তর্জাতিক সংকট সমাধানের অঙ্গীকার করা একজন প্রেসিডেন্টের জন্য এসব ব্যর্থতা স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে।
ট্রাম্প এখন সাংবাদিকদের প্রশ্নবাণে ও এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপরও ধৈর্য হারিয়ে ফেলছেন। চলতি সপ্তাহে পররাষ্ট্রনীতির বিষয় নিয়ে চেপে ধরা সাংবাদিকদের ওপর তিনি চটে যান এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করতে ইরানের সাথে আলোচনায় থাকা মার্কিন মিত্র ওমানে বোমা ফেলার হুমকি আবারও দেন।
চলতি বছরের ৭ সেপ্টেম্বর লেবার ডে-র সময় থেকেই ঐতিহ্যগতভাবে মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচার-প্রচরণা পুরোদমে শুরু হতে যাচ্ছে। এ অবস্থায় বিদেশে অমীমাংসিত সংঘাত এবং নিজ দেশে এর বিরূপ অর্থনৈতিক প্রভাবের কারণে রিপাবলিকান পার্টি মার্কিন কংগ্রেস বা প্রতিনিধি পরিষদে তাদের নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কায় রয়েছে।
ইরান অচলাবস্থার রাজনৈতিক মাশুল
কয়েক সপ্তাহ ধরে কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা চালানোর পর তেহরানের সাথে আলোচনা বাতিল করেছেন ট্রাম্প। গত বুধবারে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রটির বিরুদ্ধে “অর্থনৈতিক যুদ্ধাবস্থার” বা নিষেধাজ্ঞার নতুন কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। মাসব্যাপী সামরিক হামলা চালিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া অনুযায়ী, ইরানকে নতি স্বীকার করাতে না পারাকেই পরোক্ষভাবেই স্বীকার করা হয় ট্রাম্পের এ ঘোষণার মাধ্যমে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে অব্যাহত মুদ্রাস্ফীতি এবং ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে থাকায় রয়টার্স/ইপসোসের সর্বশেষ জনমত সমীক্ষায় ট্রাম্পের গ্রহণযোগ্যতার হার নেমে এসেছে সর্বনিম্নে; যেখানে মাত্র ৩৩ শতাংশ আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার পারফরম্যান্সে সন্তুষ্ট বলে জানিয়েছেন।
বিশ্বের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সংঘাতে শান্তি প্রতিষ্ঠার– ট্রাম্প প্রশাসনের অন্য উদ্যোগগুলোও একইভাবে থমকে গেছে।
গত সোমবারে গাজা শান্তিচুক্তি এগিয়ে নেওয়ার আলোচনা থেকে খালি হাতে ফিরেছেন ট্রাম্পের মধ্যস্থতাকারী ও জামাতা জ্যারেড কুশনার। অন্যদিকে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে দীর্ঘদিনের স্তব্ধ কূটনৈতিক আলোচনা পুনরুজ্জীবিত করতে কুশনার ও ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের কিয়েভ সফরের কথা থাকলেও— তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
গাজায় যুদ্ধবিরতি এবং ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে বন্দি করার মতো প্রাথমিক কিছু অর্জনের পর, ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির সাফল্য এখন ক্রমশ থমকে যাওয়া কূটনৈতিক প্রচেষ্টার কারণেই বেশি চিহ্নিত হচ্ছে।
ওয়াশিংটন-ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ফেলো আসলি আয়দিনতাসবাস বলেন, “ট্রাম্প ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের স্বাচ্ছন্দ্যমূলক পররাষ্ট্রনীতির ধারাকে সফলভাবে চ্যালেঞ্জ ও অস্থিতিশীল করেছেন সত্য, কিন্তু সেই অস্থিতিশীলতাকে আমেরিকানদের জন্য সুনির্দিষ্ট সুফলসংবলিত কোনো কৌশলে রূপান্তর করতে পারেননি।”
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইরান যুদ্ধের পরীক্ষা
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ট্রাম্পের এক ঘনিষ্ঠ সহযোগী জানান, ইরানের সাথে সংঘাত প্রেসিডেন্টের ওপর ‘তীব্র’ মানসিক চাপ সৃষ্টি করেছে এবং হোয়াইট হাউসের ভেতরে এই সংকট কীভাবে সমাধান করা হবে, তা নিয়ে কোনো ঐক্যমত নেই।
বিনিয়োগকারীরা যদি মনে করেন যে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হবে, তবে তা যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ গ্রহণের খরচ বাড়িয়ে দেবে এবং ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ এজেন্ডাকে আরো সংকুচিত করবে—যার ফলে চাপ আরো বাড়তে পারে। ট্রাম্প অবশ্য বলেছেন, ইরান যাতে পরমাণু অস্ত্র না পায় তা নিশ্চিত করতে এই অর্থনৈতিক মাশুল দেওয়া যুক্তিযুক্ত। যদিও ইরান বরাবরই তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির সামরিক উদ্দেশ্যের কথা অস্বীকার করে আসছে।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যানা কেলি বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সফলভাবে আমেরিকাকে পুনরায় মর্যাদার আসনে বসিয়েছেন এবং এর ফলাফল বলছে—নয়টি যুদ্ধ শেষ হয়েছে, গাজা থেকে জিম্মিরা মুক্ত হয়েছে, বাণিজ্য চুক্তিগুলো আরো ন্যায্য হয়েছে এবং এখন ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে দেওয়া হবে না।”
ট্রাম্প প্রশাসনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধ ইরানের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দিয়েছে এবং দেশটিকে ‘পুরোপুরি দেউলিয়া’ করে ফেলেছে। তিনি আরো যোগ করেন, “আগামী সপ্তাহগুলোতে প্রয়োগ করার মতো বহু কৌশল প্রেসিডেন্টের হাতে রয়েছে।”
অপ্রথাগত শৈলী ও মিশ্র ফলাফল
কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ অবশ্য ট্রাম্পের এমন সব জটিল সমস্যা সমাধানের সদিচ্ছাকে সাধুবাদ জানান, যা অন্যান্য প্রেসিডেন্টরা হয় সমাধান করতে পারেননি অথবা সমাধান করতে চাননি।
হাডসন ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো নিক স্নাইডার বলেন, “প্রেসিডেন্ট আরো স্থিতিশীল একটি বিশ্ব চান। তার মানে হলো- ইউক্রেনের মতো অগ্নিগর্ভ ইস্যু, কিংবা বাণিজ্য ও অতিরিক্ত উৎপাদনের মতো শীতল দ্বন্দ্বে সমাধান খোঁজা।” তিনি আরো উল্লেখ করেন, ট্রাম্প রুয়ান্ডা ও গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র এবং থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যকার সংঘাত নিরসনেও কাজ করেছেন।
ট্রাম্প শান্তি প্রতিষ্ঠার ঐতিহ্যগত কূটনৈতিক নীতি পরিবর্তন করে, মার্কিন মিত্রদেরসহ প্রতিপক্ষের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি প্রয়োগের নীতির ওপর নির্ভর করেছেন, কিন্তু এই অপ্রথাগত কৌশল মিশ্র ফলাফল এনে দিয়েছে।
ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণ বন্ধের লক্ষ্যে তিনি সব পক্ষকে আলোচনার টেবিলে এনেছিলেন ঠিকই, তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের দীর্ঘতম এই সংঘাত সমাধানের ধারেকাছেও পৌঁছায়নি; গত বৃহস্পতিবারই ইউক্রেনের রাজধানীতে সর্বশেষ রুশ হামলায় ১৬ জন নিহত হয়েছেন।
এদিকে গাজায় গত বছরের অক্টোবরে ট্রাম্পের প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে ইসরায়েল ও হামাস উভয় পক্ষই অনাগ্রহ দেখানোর পর ভূখণ্ডটিতে ইসরায়েলের জোরদার বিমান হামলা সংঘাত অবসানের প্রচেষ্টাকে নস্যাৎ করছে বলে আশঙ্কা করছেন মধ্যস্থতাকারীরা। লেবাননে দুই দেশের মধ্যে মার্কিন মধ্যস্থতায় হওয়া শান্তি কাঠামো কার্যকর থাকা সত্ত্বেও— গত রোববারে ইসরায়েলি বিমান হামলায় ১১ লেবানিজ নিহত হয়েছেন।
ট্রাম্পের উল্লেখযোগ্য একটি সাফল্য এসেছে ভেনেজুয়েলায়, যেখানে মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে বন্দি করে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই অপারেশন ট্রাম্পকে বিশ্বাস করতে সাহায্য করেছিল যে ইসরায়েলের সাথে যোগ দিয়ে ইরানে আক্রমণ করাও মসৃণভাবে সম্পন্ন হবে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি একটি ভুল হিসাব প্রমাণিত হয়েছে। তাদের যুক্তি হলো, ইরানের অর্থনৈতিক দুর্বলতা সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা কিংবা পিছু হটার তেমন নাগিদ অনুভব করছেন না ইরানের নেতৃবৃন্দ। এই অবস্থায়, ট্রাম্প অতিরিক্ত মাত্রায় বলপ্রয়োগের কৌশলের ওপর নির্ভর করেছেন।
কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের জ্যেষ্ঠ ফেলো স্টিফেন ওয়ার্থহাইম বলেন, “তিনি (ট্রাম্প) প্রতিপক্ষকে নিজ ইচ্ছায় নতি স্বীকার করাতে বাধ্য করতে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ এবং কখনো চাটুকারিতার ওপর অন্ধভাবে নির্ভর করেন, কিন্তু তাদের কৌশলগত লক্ষ্য ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি সম্পর্কে উদাসীন থাকেন। ফলে তিনি ক্রমাগত ব্যর্থ হচ্ছেন ও খাবি খাচ্ছেন।”
এদিকে মার্কিন রাজনীতির ঘড়ির কাঁটা দ্রুত গড়াচ্ছে। ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি এমন এক নির্বাচনের মুখোমুখি, যেখানে তারা পার্লামেন্টের এক বা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে। এতে ট্রাম্পের ক্ষমতার শেষ দুই বছরে নিজস্ব এজেন্ডা এগিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা ব্যাপকভাবে সীমিত হয়ে যাবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বলপ্রয়োগের ওপর ট্রাম্পের অতিরিক্ত নির্ভরতা প্রতিপক্ষকে আলোচনার টেবিলে আনতে পারলেও প্রায়শই কোনো স্থায়ী চুক্তি তৈরি করতে ব্যর্থ হয়—যা শত্রুপক্ষকে কেবল সময়ক্ষেপণ করতে উৎসাহিত করে।
আয়দিনতাসবাস বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষরা ভালো করেই বোঝে, তাদের চেয়ে ট্রাম্পের রাজনৈতিক সময়সীমা বেশ সংক্ষিপ্ত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রচণ্ড অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ সৃষ্টি করতে পারলেও—শেষ পর্যন্ত হয়তো ধৈর্য হারিয়ে ফেলবে। তাই পুতিন, শি জিনপিং এবং ইরান ওয়াশিংটনকে সময় পার করে দেখতে চাইবে। নভেম্বরের পর ট্রাম্পকে এড়িয়ে সময় কাটানোর এই সুযোগ তাদের জন্য আরো স্পষ্ট হয়ে উঠবে।”
আরও পড়ুন
- সর্বশেষ খবর
- সর্বাধিক পঠিত
