গাজী নজরুলের বাসা থেকে পাওয়া মরিয়মের রেখে যাওয়া শেষ চিঠি

| আপডেট :  ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:২৬  | প্রকাশিত :  ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:২৬

জাতীয় সংসদের অফিসিয়াল প্যাড, সাদা কাগজ কিংবা লাল-কালো কালির আঁচড়-প্রতিটি পাতাতেই যেন জমে আছে এক সম্পর্কের টানাপোড়েন। কোথাও গভীর ভালোবাসা, কোথাও বিশ্বাসভঙ্গের যন্ত্রণা, আবার কোথাও পরাজয়ের আক্ষেপ ও আত্মসম্মান রক্ষার কঠিন ঘোষণা।

এমপি গাজী নজরুলের বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া হাতে লেখা এসব চিঠিতে সম্পর্কের নানা আবেগঘন মুহূর্তের কথা উঠে এসেছে। ভালোবাসার পাশাপাশি সেখানে রয়েছে প্রতারণার অভিযোগ, সম্পর্কের জটিলতা, বিশ্বাসভঙ্গ এবং তীব্র মানসিক কষ্টের কথা। নিজেকে দাবার গুটি’মনে হওয়ার কষ্টের পাশাপাশি শেষ পর্যন্ত হার না মানার প্রত্যয়ের কথাও লেখা হয়েছে এসব পাতায়।

‘‘তুমিই তো ছিলে বিপক্ষ দলের সেনাপতি’’, ‘‘আমি হেরেছি—তুমি জিতেছো’’ কিংবা ‘‘ততটা সস্তা আমি নই’’— এমন তীব্র বাক্যে ফুটে উঠেছে গভীর মানসিক দ্বন্দ্বের চিত্র।

জাতীয় সংসদের প্যাডে লেখা শেষ আক্ষেপ

জাতীয় সংসদের অফিসিয়াল প্যাডে কালো কালিতে লেখা একটি পাতায় আক্ষেপ প্রকাশ করে বলা হয়েছে—

“আমি অতি বিশ্বাস করে যুদ্ধে নেমেছিলাম তার সাথে, কিন্তু জিততে পারিনি হেরে গেলাম ময়দানে। জিতবোই বা কেমনে যুদ্ধের শেষ প্রান্তে এসে দেখি তুমিই তো ছিলে বিপক্ষ দলের সেনাপতি।’’

অধিকারের লড়াই ও ভালোবাসার অপূর্ণতা

সাধারণ একটি পাতায় নিজের অবস্থান ও ভালোবাসার টানাপোড়েনের কথা তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে লেখা-

“সে ছিল অন্য নারীর স্বামী- কাগজে কলমে অধিকার ছিল তার বউ-এর। আর আমি ছিলাম বোকা…!!! অন্য কারো স্বামীকে বানিয়েছিলাম নিজের শখের পুরুষ…!!! কাউকে অর্ধেক পাওয়ার চেয়ে হারিয়ে ফেলা বেশি সম্মানের কারণ… ভালোবাসা কখনোই ভাগ করে নেওয়ার বিষয় নয়… ভালোবাসা হয় সম্পূর্ণ, না হয় অপূর্ণ!”

বিশ্বস্ততার বদলে ‘দাবার গুটি’

বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে প্রতারিত হওয়ার অনুভূতিও প্রকাশ করা হয়েছে একটি পাতায়। সেখানে লেখা হয়েছে-

“সে বলেছিল- আজ থেকে আমরা বন্ধু–চলো একটা গেমস খেলি। আমিও সরল মনে বিশ্বাস করে রাজি হয়েছিলাম। কিন্তু কে জানতো— আমিই ছিলাম তোমার গেমসের দাবার এক গুটি।

পরাজয় ও সতর্কবার্তা

জাতীয় সংসদের প্যাডে লেখা অন্য একটি পাতায় ক্ষোভ ও পরিণতির কথা তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে—

“আমি হেরেছি— তুমি জিতেছো– কারণ, আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম বলেই তো ঠকিয়ে জিততে পেরেছো। আমি, শৃঙ্গের শেষ বাড়িয়ে ও হাসতে হাসতে মুখে হাসি রেখেছি– দেখে নাও এই হাসির কারণই হবে তোমার ধ্বংসের কারণ।”

আত্মসম্মানের শেষ কথা

লাল কালিতে লেখা সংক্ষিপ্ত একটি বার্তায় নিজের আত্মসম্মানের কথা তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে লেখা—

“শুধু মায়ায় পড়েছি বলে বারবার তোমার কাছে নত হই … তা না হলে যতটা সস্তা ভাবছো ততটা সস্তা আমি নই…!’’

তারিখ সংবলিত ধর্মীয় আমলের পাতা

চিঠিগুলোর সঙ্গে ‘১২-০৭-২০২৬’ তারিখ সংবলিত একটি পাতাও পাওয়া গেছে। ওই পাতায় ঘুমানোর আগে করণীয় কয়েকটি ধর্মীয় আমলের তালিকা লেখা রয়েছে।

পাতাটিতে লেখা—

‘‘১২-০৭-২০২৬ ঘুমানোর আগে ৬টি আমল : কালেমা পড়ে, দুরুদ শরীফ, ঘুমের দোয়া, আয়াতুল কুরসী, বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম ২১ বার, আস্তাগফিরুল্লাহ ৩ বার, আল্লাহুম্মা বিসমিকা আমুতু ওয়া এহিয়া, দুরুদ শরীফ ১১ বার, ইয়া আরহামার রাহিমিন ১১ বার।’’

উদ্ধার হওয়া এসব হাতে লেখা পাতায় সম্পর্ক, ভালোবাসা, বিশ্বাসভঙ্গ, আক্ষেপ এবং আত্মসম্মান রক্ষার নানা অনুভূতির প্রকাশ দেখা যায়। একই সঙ্গে একটি লেখায় ভবিষ্যৎ পরিণতি নিয়ে কঠোর সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়েছে।

এদিকে রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত ১টার দিকে এমপি কাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগমকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. ইবনে মিজান।

শেরেবাংলা নগর থানায় সাতক্ষীরা ৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রীকে মাকসুদা বেগমকে আত্মহত্যার প্ররোচনা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এর আগে এমপি গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, মৃত মরিয়ম খাতুনের বাবা মো. মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে শেরে বাংলা নগর থানায় একটি আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলা দায়ের করেন। মামলায় এমপি গাজী নজরুল ইসলাম, তার স্ত্রী মাকসুদা বেগম এবং শ‍্যালক ওবায়দুল্লাহ— এই ৩ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

এর আগে, আমরা খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যাই এবং পরবর্তী সময়ে সিআইডির ফরেনসিক টিমকে ডাকা হয়। সুরতহাল প্রতিবেদন শেষে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। এই ঘটনায় রাতে সাতক্ষীরা ৪ আসনের এমপি কাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় শেরেবাংলা থানা পুলিশ।

রোববার সন্ধ্যায় রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানাধীন ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর বিল্ডিংয়ের তৃতীয় তলায় ২০৩ নম্বর ফ্লাটে সাতক্ষীরার-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মোছা মরিয়ম খাতুনের (১৯) ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।

উল্লেখ্য, গত জুলাইয়ে মরিয়ম খাতুনের সঙ্গে গাজী নজরুল ইসলামের ‘ব্যক্তিগত মুহূর্তের’ কয়েকটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তাকে ঘিরে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এই ঘটনার পর ২২ জুলাই সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। সাংগঠনিক তদন্তে তার নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হওয়ায় দলটির গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী তাকে বহিষ্কার এবং একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনকে বিষয়টি অবগত করা হয়।

 

আরও পড়ুন


  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত