রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিলে আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ সংগঠনকে ফেরানোর অভিযোগ, ফিজিওথেরাপি অঙ্গনে ক্ষোভ

আল আমিন, যবিপ্রবি প্রতিনিধি: বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিলে (বিআরসি) একটি বিতর্কিত পেশাজীবী সংগঠনকে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ ঘিরে ফিজিওথেরাপি পেশাজীবীদের মধ্যে অসন্তোষ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ ফিজিক্যাল থেরাপি অ্যাসোসিয়েশনকে কাউন্সিলের সহযোগী সংগঠন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা চলছে। অথচ সংগঠনটি অতীতে বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল প্রতিষ্ঠার প্রকাশ্যে বিরোধিতা করেছে এবং এর বিরুদ্ধে আন্দোলনেও অংশ নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে রোববার (১১ অক্টোবার ২০২৬) সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে একটি সভা আহ্বান করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বাংলাদেশ ফিজিওথেরাপি অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএ) দীর্ঘদিন ধরে দেশের ফিজিওথেরাপি পেশাজীবীদের অধিকার, স্বার্থ সংরক্ষণ এবং পেশাগত উন্নয়নে কাজ করে আসছে। পুনর্বাসনসেবা সম্প্রসারণ ও পেশাজীবীদের যৌক্তিক দাবি আদায়েও সংগঠনটির ভূমিকা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যমান পেশাজীবী সংগঠনের পরিবর্তে অন্য একটি সংগঠনকে কাউন্সিলের প্রতিনিধিত্ব কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগ উঠেছে, বাংলাদেশ ফিজিক্যাল থেরাপি অ্যাসোসিয়েশনের কয়েকজন পদস্থ নেতার সঙ্গে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের পারিবারিক ও ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছিল। এসব সম্পর্কের প্রভাব সংগঠনটির পেশাগত ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে পড়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন পেশাজীবীদের একাংশ। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
এদিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী সংগঠনের সদস্যপদ না থাকার অভিযোগও উঠেছে বাংলাদেশ ফিজিক্যাল থেরাপি অ্যাসোসিয়েশনের বিরুদ্ধে। পেশাজীবীদের একাংশের প্রশ্ন, আন্তর্জাতিক পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, সাংগঠনিক গ্রহণযোগ্যতা ও প্রতিনিধিত্বের যোগ্যতা যথাযথভাবে পর্যালোচনা না করে বিতর্কিত একটি সংগঠনকে কাউন্সিলের অংশীজন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ কতটা যৌক্তিক। তবে আন্তর্জাতিক সদস্যপদ বিআরসিতে প্রতিনিধিত্বের আইনগত পূর্বশর্ত কি না, সে বিষয়েও স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তাঁরা।
শুধু তা-ই নয়, সংগঠনটির সাংগঠনিক কাঠামো ও বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের অভিযোগ, সংগঠনটির কার্যনির্বাহী কমিটির নির্দিষ্ট মেয়াদ এবং হালনাগাদ বৈধ সদস্যতালিকা সম্পর্কে স্পষ্ট ও যাচাইযোগ্য তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে একটি জাতীয় নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানে সংগঠনটির প্রতিনিধিত্বের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে কমিটির মেয়াদ, নির্বাচনপ্রক্রিয়া, সদস্যতালিকা এবং সাংগঠনিক নথিপত্র যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
জানা গেছে, দেশের পুনর্বাসনসেবা ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের কার্যক্রম সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে ২০১৮ সালের ১৪ নভেম্বর বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল আইন প্রণীত হয়। পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালে কাউন্সিলের বিধিমালা এবং ২০২৬ সালে পুনর্বাসন পেশাজীবী নিবন্ধন ও প্রাকটিশনার লাইসেন্সসংক্রান্ত প্রবিধানমালা প্রণয়ন করা হয়। এসব আইনি কাঠামোর মাধ্যমে পুনর্বাসনসেবার মানোন্নয়ন, পেশাজীবীদের নিবন্ধন এবং পেশাগত জবাবদিহি নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল আইন, ২০১৮-এর ৫(১)(ম) ধারায় সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী সংগঠন থেকে প্রতিনিধিত্বের বিধান রয়েছে। পেশাজীবীদের একাংশের মতে, কাউন্সিলে কোনো সংগঠনকে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে তার পেশাগত গ্রহণযোগ্যতা, প্রতিনিধিত্বের যথার্থতা, সাংগঠনিক স্বচ্ছতা এবং পূর্ববর্তী কার্যক্রম বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
এ বিষয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে বাংলাদেশ ফিজিক্যাল থেরাপি অ্যাসোসিয়েশনের অতীত ভূমিকা নিয়ে। পেশাজীবীদের অভিযোগ, সংগঠনটি একসময় বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল প্রতিষ্ঠার প্রকাশ্যে বিরোধিতা করেছিল। এমনকি কাউন্সিল গঠনের উদ্যোগের বিরুদ্ধে আন্দোলন ও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করার অভিযোগও রয়েছে সংগঠনটির বিরুদ্ধে। যে প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করা হয়েছিল, সেই প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব কাঠামোয় এখন সংগঠনটির অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ নেওয়ায় সংশ্লিষ্টদের মধ্যে নতুন করে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ফিজিওথেরাপি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সাভারের পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্রের ফিজিওথেরাপি বিভাগের প্রধান মুহাম্মদ আনোয়ার হোসেন অভিযোগ করেন, বাংলাদেশ ফিজিক্যাল থেরাপি অ্যাসোসিয়েশন অতীতে রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের বিরোধিতা করেছিল। কাউন্সিলের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও সংগঠনটির বিরুদ্ধে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অভিযোগ রয়েছে। এমন একটি সংগঠনকে নতুন করে কাউন্সিলের অংশীজন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ পেশাজীবীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
অন্যদিকে কাউন্সিলের কার্যক্রম ঘিরে চলমান বিতর্ক ও পেশাগত নিবন্ধনের অনিশ্চয়তা যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) ফিজিওথেরাপি অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগসহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফিজিওথেরাপি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। শিক্ষার্থীদের আশঙ্কা, কাউন্সিলের কার্যক্রমে দীর্ঘসূত্রতা অব্যাহত থাকলে পড়াশোনা শেষ করেও পেশাগত নিবন্ধন ও প্রাকটিশনার লাইসেন্স পেতে বিলম্ব হতে পারে। কবে নাগাদ নিবন্ধন পাওয়া যাবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট নিশ্চয়তা না থাকায় তাঁদের পেশাগত ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।
যবিপ্রবির একজন শিক্ষার্থীর বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন পড়াশোনা করে দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে অবদান রাখতে চাই। কিন্তু রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিলের নিবন্ধন প্রক্রিয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন করে তুলছে। পড়াশোনা শেষ করে কবে নিবন্ধন পাব, সে বিষয়ে স্পষ্ট নিশ্চয়তা প্রয়োজন। শুধু যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় নয়, সারা দেশের ফিজিওথেরাপি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে আমরা দ্রুত কাউন্সিলের কার্যক্রম কার্যকর করা এবং নিবন্ধন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার দাবি জানাই।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিলের কার্যক্রম স্বচ্ছ ও কার্যকর রাখতে পেশাজীবীদের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো সংগঠনকে অন্তর্ভুক্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত গ্রহণ এবং আইনগত বিষয়গুলো যথাযথভাবে পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। পাশাপাশি সংগঠনের অতীত ভূমিকা, সাংগঠনিক বৈধতা, আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা ও প্রতিনিধিত্বের গ্রহণযোগ্যতা যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন পেশাজীবীদের একাংশ।
তাঁদের আশঙ্কা, কাউন্সিলের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে সাংগঠনিক বিরোধ দীর্ঘায়িত হলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে পেশাগত নিবন্ধন ও পুনর্বাসনসেবার উন্নয়ন কার্যক্রমে। তাই কোনো পক্ষের রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক প্রভাবের পরিবর্তে আইন, যোগ্যতা ও পেশাগত গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
এদিকে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানা গেছে, রোববার দুপুরের পর এ বিষয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সভায় বাংলাদেশ ফিজিক্যাল থেরাপি অ্যাসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ ফিজিওথেরাপি অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীরা আশা করছেন, কাউন্সিলের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে সৃষ্ট বিতর্ক নিরসনে কর্তৃপক্ষ আইন, পেশাগত যোগ্যতা ও অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবে। একই সঙ্গে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফিজিওথেরাপি শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের নিবন্ধন প্রক্রিয়া কার্যকর করে তাঁদের পেশাগত ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
আরও পড়ুন
- সর্বশেষ খবর
- সর্বাধিক পঠিত
