কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের হানা, ট্রাম্পের সামনে যেসব বিপদ

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানদের কাছ থেকে নিজেদের দখলে নিয়েছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। এর মধ্য দিয়ে ওয়াশিংটনের ক্ষমতার সমীকরণে বড় পরিবর্তন ঘটল। সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে ট্রাম্পের প্রশাসনের কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত শুরু করা এবং প্রয়োজনে তাঁকে অভিশংসনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার সুযোগও পাবেন ডেমোক্র্যাটরা।
এখন থেকে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন ছাড়া ওই কক্ষে কোনো আইন পাস করতে পারবেন না রিপাবলিকানরা। প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে পারবে। ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে দুঃসংবাদ হলো, ডেমোক্র্যাট সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিনিধি পরিষদ তাঁর প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করতে পারবে।
কোন বিষয়ে তদন্ত শুরু হতে পারে?
প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারানোয় বিভিন্ন বিষয়ে জবাবদিহি করতে হতে পারে ট্রাম্প প্রশাসনকে। ডেমোক্র্যাটরা প্রশাসনের কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্তও শুরু করতে পারবেন। একইসঙ্গে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তলব এবং সরকারি নথি চেয়ে পাঠানোর ক্ষমতাও পাবেন তারা। ফলে প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে পারে। আর ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডও তদন্তের আওতায় আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ও ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রের ব্যবসায়িক লেনদেন খতিয়ে দেখতে চান ডেমোক্র্যাট নেতারা। যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিন-সংশ্লিষ্ট লাখ লাখ নথি প্রকাশের বিষয়েও বেকায়দায় পড়বে ট্রাম্প প্রশাসন। এছাড়াও পেন্টাগনের প্রতিরক্ষা খাতের অর্থ ট্রাম্প পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে যাচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে চান ডেমোক্র্যাটরা।
ডেমোক্র্যাটরা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেলে কী হবে?
Advertisement
কেবিনেট সদস্য, রাষ্ট্রদূত ও ফেডারেল বিচারপতি নিয়োগে সিনেটর অনুমোদন প্রয়োজন হয়। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য।তাই সিনেটর নিয়ন্ত্রণ থাকলে ট্রাম্পের অনেক নিয়োগ আটকে দিতে বা বিলম্বিত করতে পারবে ডেমোক্র্যাটরা। আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও হোয়াইট হাউসকে তাদের সঙ্গে সমঝোতায় আসতে বাধ্য করতে পারবে। এছাড়াও কর কর্তন, অভিবাসন বা নতুন শুল্ক নীতি সংক্রান্ত কোনো আইন পাস করতে গেলে তাঁকে ডেমোক্র্যাটদের অনুমোদনের ওপর নির্ভর করতে হবে।আইন নির্দেশিকা দেখুন
ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ বা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেলে ট্রাম্প প্রশাসনের চাওয়া বাজেট ও ব্যয়ের প্রস্তাব নিয়ে দর-কষাকষি করতে পারবে। প্রশাসনের কোনো কর্মসূচির জন্য অর্থ বরাদ্দ আটকে দেওয়া বা শর্ত যুক্ত করার চেষ্টা হতে পারে। এ নিয়ে সমঝোতা না হলে ২০২৭ সালে সরকারি অর্থায়ন নিয়ে অচলাবস্থা এবং শাটডাউনের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে বলে রয়টার্সের বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং পররাষ্ট্রনীতিও কংগ্রেসের সঙ্গে বিরোধের বিষয় হয়ে উঠতে পারে। তবে এসব ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের হাতে থাকা ক্ষমতা এক রকম নয়। কিছু শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টকে কংগ্রেসের দেওয়া আইনি ক্ষমতার ওপর নির্ভর করতে হয়। আবার অভিবাসন ও পররাষ্ট্রনীতির অনেক সিদ্ধান্ত নির্বাহী বিভাগের মাধ্যমে নেওয়া সম্ভব। ফলে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলেই ট্রাম্পের শুল্কনীতি বা অভিবাসননীতি সরাসরি বন্ধ করে দিতে পারবে, বিষয়টি এমন নয়। তবে শুনানি, তদন্ত, বাজেট বরাদ্দ এবং নতুন আইন প্রণয়নের মাধ্যমে এসব নীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারবে।
অভিশংসিত হতে পারেন ট্রাম্প?
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ‘সবচেয়ে অজনপ্রিয় রাষ্ট্রপতি’ ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তৃতীয়বারের মতো অভিশংসন বা অনাস্থার বিষয়টি একেবারে উড়িয়ে দেননি ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফরিস। প্রতিনিধি পরিষদের বর্তমান রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা স্টিভ স্ক্যালিসের ধারণা, নতুন কংগ্রেসের প্রথমদিন থেকেই ট্রাম্পকে অভিশংসনের উদ্যোগ নিতে পারে ডেমোক্র্যাটরা। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিশংসনের অভিযোগ আনার একক ক্ষমতা প্রতিনিধি পরিষদের হাতে। প্রতিনিধি পরিষদে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় অভিশংসনের প্রস্তাব পাস হলে বিষয়টি সিনেটে বিচারপ্রক্রিয়ায় যাবে। সেখানে প্রেসিডেন্টকে দোষী সাব্যস্ত করে অপসারণ করতে উপস্থিত সিনেটরদের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন প্রয়োজন। অর্থাৎ শুধু প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেই ট্রাম্পকে ক্ষমতা থেকে সরানো সম্ভব হবে না।
ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়ারাজনৈতিক খবর পড়ুন
এদিকে, সিবিএস নিউজকে ফোনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ভেটো ক্ষমতার কথাও মনে করিয়ে দিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘আমার মনে হয়, তারা আমার সঙ্গে কাজ করতে চাইবে। তা না হলে আমি সবকিছুতেই ভেটো দেব। আর তারা নিশ্চয়ই সেটা চাইবে না।’
ইসরায়েলকে আর্থিক সাহায্য বন্ধ করছেন ট্রাম্প
তবে ফলাফলের আভাস পেয়েই নির্বাচনের একদিন আগে ৩ নভেম্বরই ইসরায়েলকে দেওয়া বার্ষিক ৪০০ কোটি ডলারের আর্থিক সাহায্য বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি জানান, এ বিষয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে তাঁর চুক্তিও হয়েছে। ফক্স নিউজের এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, ‘ইসরায়েলের এখন আর এই সহায়তার প্রয়োজন নেই। ইসরায়েলকে অর্থ দেওয়ার বিষয়ে নেতানিয়াহু ও আমি একমত হয়েছি।’
সর্বোপরি বলা যায়, মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজয় ট্রাম্পকে ক্ষমতাচ্যুত করবে না, তবে তার দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি সময়টিকে নির্বিঘ্ন নীতির বাস্তবায়ন থেকে সরিয়ে প্রশাসন ও কংগ্রেসের মধ্যকার সংঘাত, দর-কষাকষি এবং রাজনৈতিক সমঝোতার এক নতুন অধ্যায়ে পরিণত করবে।রাজনৈতিক খবর পড়ুন
আরও পড়ুন
- সর্বশেষ খবর
- সর্বাধিক পঠিত
