পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের গরু কোরবানি না করার আহ্বান নাখোদা মসজিদের ইমামের

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত ‘নাখোদা মসজিদ’ রাজ্যটিতে ‘বড় মসজিদ’ নামে পরিচিত। ঈদ ও রমজানের চাঁদ ওঠার ঘোষণা এই মসজিদের ট্রাস্টি বোর্ড করে থাকে। সারা পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমরা নাখোদা মসজিদের ঘোষণা অনুযায়ী ধর্মীয় কর্তব্য সম্পাদন করে থাকেন। এই মসজিদের ইমাম মাওলানা মুহাম্মদ শফিক কাসেমি এবার রাজ্যের মুসলিমদের প্রতি এক বিশেষ বার্তা দিয়েছেন। তিনি তাদের আহ্বান করেছেন, তারা যেন আসন্ন ঈদুল আজহায় গরু কোরবানি না করেন।
রোববার (১৭ মে) হিন্দুস্তান টাইমস জানায়, রাজ্যে নতুন সরকার আসতেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে কার্যকর করা হয়েছে কঠোর নিয়ম এবং আইন। এমন পরিস্থিতিতে রাস্তায় নামাজ আদায় থেকে শুরু করে আজানের মাইকিং এবং গরু জবাইয়ের ওপরও কঠোর শর্তারোপ করা হয়েছে। এর প্রতিবাদেই তিনি এই আহ্বান জানান।
গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে মাওলানা মুহাম্মদ শফিক কাসেমি বলেন, বর্তমান সরকার গরু কোরবানি নিয়ে যে আইনটির কথা বলেছে, তা বিজেপি বানায়নি। সেই আইনটি বেশ পুরনো। ১৯৫০ সালে তৈরি হয়েছিল। সেই আইনটিকেই বর্তমানে বিজেপি সরকার বাস্তবায়ন করছে। এই আইনে যে সমস্ত শর্তের কথা বলা হয়েছে তাতে গরু কোরবানি করা বেশ কঠিন হবে। এ ছাড়া অন্য সময় গরু জবাই করাও এই নিয়ম অনুযায়ী বেশ কষ্টকর হবে। তাই আমি সব মুসলিমদের কাছে আবেদন করব, শুধু গরু কোরবানি নয়, আপনারা গরুর গোশত খাওয়াও চিরতরে বন্ধ করে দিন।
মাওলানা শফিক কাসেমি এই গুরুত্বপূর্ণ বিবৃতিতে আরো বলেন, বাংলার নতুন সরকারের কাছে আমার আবেদন, আপনারা গরুকে ‘জাতীয় প্রাণী’র মর্যাদা দিন। আর গরু জবাই করা এবং গরুর গোশত বিদেশে রফতানি করা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করুন। শুধু কোরবানি নয়, বহু মন্দিরে হিন্দুরা পশু বলি দিয়ে থাকেন। সেটাও বন্ধ করা হোক। তাই আমার আবেদন, গরুকে ‘জাতীয় প্রাণী’র মর্যাদা দিয়ে গরু জবাই সম্পূর্ণ বন্ধ করুন, যাতে সব সময়ের জন্য এই ঝগড়া বন্ধ হয়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, সেইসাথে বলব, আমাদের দু-মুখো নীতি গ্রহণ করা উচিত নয়। গরু জবাই বন্ধ হবে, অথচ কিছু ব্যক্তি গরু জবাই করে হালাল সার্টিফিকে দিয়ে গো-মাংস বাইরে রফতানি করে কোটি কোটি টাকা কামাবে, তাও বন্ধ হওয়া উচিত।
বরেণ্য এই আলেম বলেন, রফতানিকারক কোম্পনিগুলো বিশাল বিশাল স্লটার হাউস তৈরি করে তাতে গরু জবাই করবে এবং এই গোশত বিদেশে রফতানি করছে। অথচ মুসলিমদের বলা হচ্ছে তোমরা
গরু জবাই করতে পারবে না, গরুর গোশত খেতে পারবে না। মুসলিমদের গরুর গোশত নিয়ে নানাভাবে পেরেশান করা হচ্ছে। তাদের পেটানো হচ্ছে এবং হত্যা করার ঘটনাও ঘটছে। এটা কিন্তু অন্যায় জুলুম।
মাওলানা শফিক কাসেমি আরো বলেন, গরু জবাই বন্ধ হলে সব থেকে বেশি ক্ষতি কিন্তু মুসলিমদের হবে না, হবে হিন্দু ভাইদের। সরকারের কাছে আমি আবেদন করছি, গরু জবাইয়ের সমস্ত স্বীকৃত কসাইখানা বা স্লটার হাউস বন্ধ করে দিন। মুসলিমদের আমি বলব, আপনারা ছাগল, ভেড়া এগুলো কিনে কোরবানি দিন। কোনো বড় পশু জবাই করা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিন। এই বকরি, ছাগল বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মুসলিমরাই প্রতিপালন করেন। যদি আপনারা ছাগল বা মেষ কোরবানি করেন, তাহলে মুসলিমদেরই লাভ হবে। তাদের আর্থিক অবস্থা মজবুত হবে।
তিনি আরও বলেন, আপনারা সরকারের সাথে কোনো সঙ্ঘাতে যাবেন না। আমি দাবি করছি, গরু জবাই সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিন।
তিনি বলেন, সরকার এও বলেছে যে, আপনারা প্রকাশ্যে কোনো পশু জবাই করবেন না। পশু জবাই
হবে স্লটার হাউসে। কিন্তু তার জন্য পশু চিকিৎসক বা ভেটনারি ডাক্তারের সার্টিফিকেট লাগবে। কিন্তু এই কাজটি কে করবে? ভেটনারি সার্টিফিকেট দেয়ার কাজ তো সরকারের করা উচিত। কাজেই বিভিন্ন এলাকায় স্লটার হাউস বানিয়ে সার্টিফিকেট দেয়ার দায়িত্ব সরকারি পশু চিকিৎসকের ওপর বর্তায়। সরকারের উচিত ছিল, আগেই পশু চিকিৎসক, স্লটার হাউসের ব্যবস্থা করে দিয়ে তারপরই এই কানুন করা। তাহলে কারো কোনো বিভ্রান্তি হত না। এখন তো মুসলিমরা পেরেশান হচ্ছে। তবে ক্ষতি হিন্দু ভাইদেরও হচ্ছে। কারণ, যে ঘোষ, যাদবরা আছেন তারা গরু পালন করেন। আর তারা সেই সময় পর্যন্ত গরু পালন করেন যতদিন গরু দুধ দেয়, গরুর প্রজনন ক্ষমতা থাকে। আর যখন গরু দুধ দেয়া বন্ধ করে দেয় তখন ঘোষ বা যাদবরা কোরবানি ঈদের সময় তা বাজারে বিক্রি করে দেন। ওই সময় ১৫-৩০ হাজারের গরু তারা ১ লাখ টাকায় বিক্রি করে দেয়ার সুযোগ পান। বন্ধ্যা হয়ে যাওয়া গরুগুলো কোনো চাহিদা থাকে না। কেউ তা কিনতে চায় না। আর যদি গো-পালকরা সেই গরুগুলোকে রেখে দেয়, তাহলে গরুর খাওয়া ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তাদের প্রতিদিন ৪০০-৫০০ টাকা করে খরচ করতে হয়। কিন্তু এই টাকা তারা কোথায় পাবে? আর গরু মরে গেলে তারা তো কিছুই পাবে না। তারা কোরবানি ঈদের সময় একটা গরু বিক্রি করে ৪টি ভালো গরু কিনতে পারতেন। এতে হিন্দু ভাইদের কারবার, দুধ বিক্রি মানে তাদের আর্থিক অবস্থা মজবুত হতো। কিন্তু গরু জবাই বন্ধ হলে ক্ষতি তো আমাদের হিন্দু ভাইদের। কিন্তু এখন যদি মুসলিমরা গরু জবাই করে তাহলে তাদের শাস্তি পেতে হবে। ছয় মাসের জেল-জরিমানা হবে। জামিন অযোগ্য ধারা প্রয়োগ করা হবে। তাই মুসলিমদের কাছে আমার আবেদন, আপনারা সম্পূর্ণভাবে গরুর গোশত খাওয়া ও গরু জবাই বন্ধ করে দিন। গরু কোরবানিই করবেন না।
তিনি বলেন, ১৯৫০ সালের এই আইনটি কংগ্রেস, সিপিএম বা তৃণমূল সরকার করেনি। তারা মুসলিমদের শুধু ললিপপ দিয়েছে। আর গরুর গোশত খাওয়ার আজাদি দিয়ে দিয়েছিল। কানুন ছিল কিন্তু প্রয়োগ ছিল না। আগের সরকারগুলির নীতি ছিল, গরুর গোশত খাও আর আমাদের ভোট দাও। এখন বিজেপি সরকার এসেছে, তারা কানুন বাস্তবায়ন করছে। সরকার যে নির্দেশিকা জারি করেছে, তাতে বলা হয়েছে কোরবানি করার জন্য প্রাণীর বয়স ১৪ বছরের বেশি হতে হবে। তার জন্য পশু চিকিৎসকের সার্টিফিকেট আবশ্যক। দ্বিতীয়ত, কোরবানি উন্মুক্ত স্থানে হবে না, স্লটার হাউসে হতে হবে। খুব ভালো কথা। বাস্তবায়ন করুন। কিন্তু পঞ্চায়েত প্রধান ও পশু চিকিৎসকের একত্রিত সার্টিফিকেট জোগাড় করা খুবই মুশকিল একটি কাজ। তাই ফের বলব, আপনারা গরু কোরবানি ও গরুর গোশত খাওয়া বন্ধ করে দিন।
এদিকে পশ্চিমবঙ্গ সংখ্যালঘু কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান আহমদ হাসান ইমরানও শনিবার সংবাদমাধ্যমকে প্রায় একই কথা বলেছেন। তিনি মুসলিমদের পরামর্শ দেন, আপনারা কোনো জটিলতা বা জেদের মাধ্যমে কাজ করবেন না। বরং কোরবানির বিধান পালন করার জন্য গরু ব্যতীত ছাগল, ভেড়া বা অন্য ছোট পশু কোরবানি করুন। বিজেপি প্রশাসনের সাথে সঙ্ঘাত এড়িয়ে চলুন। সূত্র : পুবের কলম ও অন্যান্য
আরও পড়ুন
- সর্বশেষ খবর
- সর্বাধিক পঠিত
