আদমদীঘির সান্তাহারে পৌরসভার প্ল্যান ছাড়াই চলছে বাড়িঘর নির্মাণ, রাজস্ব বঞ্চিত সরকার

প্রতিনিধি, আদমদীঘি (বগুড়া) : উপজেলার সান্তাহার পৌরসভা শহরে পাকা ও সেমিপাকা ইমারত নির্মাণে মোটা অঙ্কের অবৈধভাবে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে অনুমোদিত নকশা (প্ল্যান) ছাড়াই বহু বাড়িঘর তথা ইমারত নির্মিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে করে সরকার লাখ লাখ টাকার রাজস্ব পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে।
স্থানীয়দের অভিযোগে জানা যায়, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পৌর পরিষদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা প্রায় দুই বছর ধরে না থাকার কারণে পৌর প্রশাসনের রাজস্ব আয়ের প্রধান খাত প্রকৌশল বিভাগের যথাযথ তদারকি দুর্বল হয়ে পড়েছে। সেই সুযোগে প্রকৌশল বিভাগের খণ্ডকালীন নিয়োগ প্রাপ্ত অসাধু এক প্রকৌশলী ও কতিপয় কার্যসহকারির সিন্ডিকেট পৌর প্ল্যান তথা নকশা অনুমোদন দেওয়ার নাম করে মোটা অঙ্কের অবৈধ অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে দুর্নীতির রাজত্ব কায়েম করেছে।
এই সময়ের মধ্যে পৌর এলাকায় নির্মাণ হওয়া ও নির্মাণ কাজ চলমান থাকা অধিকাংশ বাড়িঘরেরই পৌর প্রকৌশল বিভাগের অনুমোদন নেই। কিন্তু ইমারত নির্মাণকারীদের অভিযোগ, প্ল্যান দেওয়ার জন্য তাদের নিকট থেকে রশিদ ছাড়াই টাকা নেওয়া হয়েছে। অথচ স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) গৃহনির্মাণ আইন, ১৯৯৬ অনুযায়ী অনুমোদন ছাড়া কোনো ইমারত নির্মাণ, পুনঃর্নির্মাণ বা পরিবর্তন সম্পূর্ণ অবৈধ। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সরেজমিনে পৌরসভা শহরের তারাপুর, মালশন, কলসা, কাজীপুর ও বিপুলসহ বিভিন্ন পাড়া- মহল্লায় পৌর প্ল্যান ছাড়াই অনেক নতুন ইমারত নির্মাণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ইমারত মালিকদের কাছে প্ল্যান অনুমোদনের বিষয়ে জানতে চাইলে অনেকে জানান, প্ল্যান বা নকশা অনুমোদন তথা পাস করে দেওয়ার জন্য টাকা নেওয়া হয়েছে কিন্তু এখনো তাদের প্ল্যান পাস হয়নি। প্রদত্ত টাকার রশিদ দেওয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে তারা না সূচক জবাব দেন।
স্থানীয়রা জানান, ‘পৌরসভার প্রকৌশল বিভাগের লোকজনকে ম্যানেজ করেই’ নির্মাণ কাজ করা হয়েছে এবং হচ্ছে। এই অনৈতিক কর্মকাণ্ডে পৌরসভার খণ্ডকালীন নিয়োগপ্রাপ্ত উপ-সহকারী প্রকৌশলী মাসফিকুর রহমান মাসফি ও তার সহযোগী সিন্ডিকেটের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওপেন- সিক্রেট। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পৌরসভার মালশন এলাকার একাধিক সচেতন ব্যক্তি জানান, পৌরসভায় খণ্ডকালীন নিয়োগ পাওয়া উপ-সহকারী প্রকৌশলী মাসফিকুর রহমান মাসফি এই গ্রামের বাসিন্দা। ফলে মালশনসহ এই এলাকায় যে-সব ইমারত নির্মাণ করা হয়েছে এবং চলমান রয়েছে, সেগুলো তার সাথে অবৈধ আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে অনুমোদন ছাড়াই করা হয়েছে এবং হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, পৌরসভায় মাসিক সামান্য বেতন পেলেও মুশফিকুর রহমান মাসফি বেশ বিলাসবহুল জীবনযাপন করেন। সান্তাহার পৌর আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা যায়, প্রকৌশলী মাসফিকুর রহমান মাসফি জুলাই আন্দোলনে ২০২৪ এর ৫ আগস্ট বিতাড়িত, শেখ হাসিনা সরকারের সময় ২০২০ সালে অনুমোদিত সান্তাহার পৌর আওয়ামী লীগের ৮ নম্বর ওয়ার্ড কমিটির বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক।
এ বিষয়ে সান্তাহার পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী ও পৌরসভার প্রশাসকের মুখপাত্র আবু রায়হান আলী মণ্ডল সাংবাদিকদের বলেন, পৌরসভার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অপসারণের পর থেকে এখন পর্যন্ত ৪৩টি প্ল্যান অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং আরও ৩১টি আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অনুমোদন ছাড়া পাকা ও সেমিপাকা ইমারত নির্মাণ কাজ পৌরসভার আইনবিরোধী। কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে মো. সৌরভ হোসেন নামের এক আইনজীবী বলেন, সরকারি দায়িত্বের অপব্যবহার করে কোনো ব্যক্তি ঘুস বা অবৈধ আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে আইনবিরোধী কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করলে তা দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৭(১) ধারা এবং দণ্ডবিধির ১৬১ ও ১৬৫ ধারার আওতায় অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। প্ল্যান অনুমোদন ছাড়া ইমারত নির্মাণের কারণে পৌরসভা নির্ধারিত ফি ও সরকার রাজস্ব পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পাশাপাশি পরিকল্পিত নগরায়ন বাধা গ্রস্থ হচ্ছে। সেকারণে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন।
এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে অভিযোগ অস্বীকার করে সান্তাহার পৌরসভার খণ্ডকালীন উপ-সহকারী প্রকৌশলী মাসফিকুর রহমান মাসফি সাংবাদিকদের বলেন, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তন ও পৌরসভায় জনবল সংকটের কারণে মাঠপর্যায়ে পৌর প্রশাসনের যথাযত তদারকি কিছুটা দুর্বল হয়েছে। সেই সুযোগে অনেকেই প্ল্যান অনুমোদন ছাড়াই বাড়িঘর নির্মাণ করছেন এবং নির্মাণ চলমান রয়েছে। পৌরসভার প্ল্যান অনুমোদনের দায়িত্ব আমার নয় এবং এসব অনুমোদনহীন নির্মাণকাজের সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
আরও পড়ুন
- সর্বশেষ খবর
- সর্বাধিক পঠিত
