বাংলাদেশ সীমান্তের পাশেই ‘চিকেনস নেক’ ঘিরে ভারতের বড় পরিকল্পনা

বাংলাদেশ সীমান্তঘেঁষা ভারতের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘চিকেনস নেক’ এলাকায় বড় অবকাঠামো পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে নয়াদিল্লি। শিলিগুড়িকে কেন্দ্র করে বুলেট ট্রেন, ভূগর্ভস্থ রেল করিডর, বিমানবন্দর সম্প্রসারণসহ একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
ভারতের দাবি, এসব প্রকল্প উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে দেশের মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করবে এবং অঞ্চলটির অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব বাড়াবে। তবে এই প্রকল্পে কলকাতাকে বাদ দেয়ায় নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি বলছে, উত্তর প্রদেশের বারাণসী থেকে শিলিগুড়িতে বুলেট ট্রেন চালুর ঘোষণা দেয়া হয়েছে সম্প্রতি। আর এই ঘোষণার পর অনেকের প্রশ্ন, পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতাকে বাদ দিয়ে কেন এই প্রকল্প নেয়া হলো? এর উত্তর হিসেবে উঠে এসেছে ভৌগোলিক অবস্থান, কৌশলগত গুরুত্ব এবং অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বিষয়টি।
পশ্চিমবঙ্গে নতুন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর কাজ আরও দ্রুত এগোবে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ‘চিকেনস নেক’ বা শিলিগুড়ি করিডোরে অবস্থিত শিলিগুড়ি ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ট্রানজিট পয়েন্ট।
এটি উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোর সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের একমাত্র স্থল সংযোগ। উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যাওয়ার সব সড়ক ও রেলপথ এই সরু ভূখণ্ড দিয়েই গেছে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়েছে, ভবিষ্যতে এই হাই-স্পিড রেললাইন আসামের রাজধানী গোয়াহাটি পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে মূল ভারতের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ‘অষ্টলক্ষ্মী’ রাজ্যগুলোর সরাসরি যোগাযোগ আরও উন্নত হবে।
এছাড়া পূর্ব ভারতের প্রথম হাই-স্পিড রেলসেবা হিসেবে শিলিগুড়ি-বারাণসী সংযোগ পশ্চিমবঙ্গেরও উপকারে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে। এতে আন্তঃআঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়বে এবং বাণিজ্য ও সেবাখাতে নতুন সুযোগ তৈরি হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বারাণসী থেকে শিলিগুড়ি যেতে সময় লাগবে মাত্র তিন ঘণ্টা।
এনডিটিভিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও বিজেপি এমপি হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা শিলিগুড়ির গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দার্জিলিং জেলার এই অঞ্চলটি দেশের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর একটি। তার ভাষায়, ‘এটি এমন একটি ভূখণ্ড, যা উত্তর-পূর্ব ভারতকে দেশের বাকি অংশের সঙ্গে যুক্ত করেছে। পুরো করিডোরটির প্রস্থ মাত্র ২২ কিলোমিটার।’
তিনি আরও বলেন, দার্জিলিং লোকসভা আসন সম্ভবত বিশ্বের একমাত্র এলাকা, যার সঙ্গে তিনটি আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে। তিনি বলেন, ‘পশ্চিমে নেপাল, পূর্বে ভুটান এবং দক্ষিণে বাংলাদেশ। আর একটু উত্তরে গেলেই চীনের সীমান্ত।’
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে নজরদারি জোরদারে কৌশলগত অবকাঠামো নির্মাণের জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকার ইতোমধ্যেই শিলিগুড়িতে ১২০ একর জমি কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে হস্তান্তর করেছে। হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা বলেন, বারাণসী-শিলিগুড়ি হাই-স্পিড রেল করিডর উত্তরবঙ্গ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তিনি বলেন, ‘বারাণসী-শিলিগুড়ি হাই-স্পিড রেল করিডর এবং পরিকল্পিত ৪০ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ রেল করিডর একসঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে দেশের বাকি অংশের সঙ্গে যুক্ত করবে’। তার মতে, দিল্লি-বারাণসী হাই-স্পিড রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে সমন্বয় করে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোর মধ্যে যাতায়াতের সময়ও কমাবে। এতে পণ্য পরিবহন, পর্যটন এবং রুটের পাশের ছোট শহরগুলোর যোগাযোগও বাড়বে।
শ্রিংলা বলেন, ‘এই গুরুত্বপূর্ণ করিডোর বাস্তবায়ন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং জাতীয় বাজেটের কৌশলগত ব্যবহারের প্রমাণ।’
এদিকে ‘চিকেনস নেক’ অঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়নে আরও কিছু প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। বাগডোগরা বিমানবন্দর ও নিউ জলপাইগুড়ি রেলস্টেশনের সক্ষমতা বাড়াতে বড় ধরনের উন্নয়নকাজ চলছে। ১ হাজার ৫৪৯ কোটি রুপি ব্যয়ে বাগডোগরা বিমানবন্দরে নতুন সিভিল এনক্লেভ নির্মাণ করা হচ্ছে।
এতে ৭০ হাজার ৩৯০ বর্গমিটারের টার্মিনাল থাকবে এবং সেখানে পিক আওয়ারে ৩ হাজার যাত্রী এবং বছরে ১ কোটি যাত্রী সেবা নেয়ার সুযোগ পাবেন। প্রকল্পে এ-৩২১ ধরনের বিমানের জন্য ১০টি পার্কিং বে, দুটি লিংক ট্যাক্সিওয়ে এবং বহুতল গাড়ি পার্কিং সুবিধাও থাকবে।
এছাড়া ৩ হাজার কোটি রুপির কেন্দ্রীয় অনুমোদনে সিকিম ও উত্তরবঙ্গের সেবাদানকারী এই বিমানবন্দরকে ২০২৭ সালের মধ্যে আধুনিক আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দরে রূপান্তর করা হবে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, এই অবকাঠামো ও যোগাযোগ উন্নয়ন শিলিগুড়িকে শুধু ট্রানজিট শহর নয়, বরং পূর্ব ভারতের শক্তিশালী আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত করবে।
শিলিগুড়ির উদ্যোক্তা সাশা শর্মা এনডিটিভিকে বলেন, ‘আমি একজন উদ্যোক্তা হিসেবে মনে করি, বুলেট ট্রেন প্রকল্পটি এই অঞ্চলের জন্য যুগান্তকারী সুযোগ। উন্নত যোগাযোগ পর্যটন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করবে।’
আরও পড়ুন
- সর্বশেষ খবর
- সর্বাধিক পঠিত
