বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে বড় পতন

মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের দ্রুত সমাধানের আশা ম্লান হয়ে যাওয়ার জেরে বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে বড় পতন দেখা দিয়েছে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সুদের হার চড়া থাকার আশঙ্কায় চলতি সপ্তাহে সামগ্রিকভাবে বড় লোকসানের মুখে পড়েছে মূল্যবান এই ধাতু।
আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শুক্রবার (৫ জুন) স্পট গোল্ড বা প্রতি আউন্স আন্তর্জাতিক স্পট স্বর্ণের দাম শূন্য দশমিক ২ শতাংশ কমে ৪ হাজার ৪৬৩ দশমিক ৭৩ ডলারে নেমে এসেছে। এই দরপতনের ফলে চলতি সপ্তাহে এখন পর্যন্ত স্বর্ণের দাম প্রায় ১ দশমিক ৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। অন্যদিকে, মার্কিন গোল্ড ফিউচার্সে আগামী আগস্টে সরবরাহের চুক্তিতে স্বর্ণের দাম শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৪৯১ ডলারে। খবর রয়টার্সের।
কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন স্থবিরতা ও যুদ্ধাবস্থা এই দরপতনের প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে। লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ মিলিশিয়া গোষ্ঠী নতুন যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে এবং ইসরায়েলও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে তারা লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে না। এর ফলে তেহরানের সঙ্গে শান্তি চুক্তি স্থাপনের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ থামানোর যে প্রচেষ্টা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চালাচ্ছিলেন, তা বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, যখন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা সঠিক দিশা পায় না, তখন সাধারণত তেলের বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে ও দাম বাড়ে। এটি মূলত বিশ্ব অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কাকে উসকে দেয় এবং সুদের হার তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ সময় চড়া থাকার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়; যা শেষপর্যন্ত স্বর্ণের দামের ওপর বড় চাপ তৈরি করে।
বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি মূলত অবরুদ্ধ বা বন্ধ থাকায় চলতি সপ্তাহে ব্রেন্ট ক্রুড অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ইতোমধ্যে ২ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে। সাধারণত স্বর্ণকে মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে সুরক্ষাকবচ হিসেবে দেখা হলেও, সুদের হার উচ্চ থাকলে সুদহীন এই ধাতুর ওপর বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বা চাহিদা কমে যায়। গত ফেব্রুয়ারির শেষদিকে ইরানের সঙ্গে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে তেলের দাম বৃদ্ধির জেরে স্বর্ণের বাজারে সামগ্রিকভাবে প্রায় ১৬ শতাংশ দরপতন হয়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বর্তমানে বছরের শেষ নাগাদ মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ কর্তৃক সুদের হার আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা করছেন। সিএমই গ্রুপের ‘ফেডওয়াচ’ টুলের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ডিসেম্বরে সুদের হার আরও এক দফা বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। সুদের হারের এই সম্ভাব্য গতিপথ আঁচ করতে বিনিয়োগকারীরা এখন যুক্তরাষ্ট্রের মে মাসের ‘নন-ফার্ম পে-রোল’ (চাকরিসংক্রান্ত তথ্য) ডেটার দিকে তাকিয়ে আছেন।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, স্বর্ণের দাম কমার প্রধান কারণ হলো বিশ্ববাজারে বড় বিনিয়োগ চাহিদার অভাব। মার্কিন অর্থনীতি এখনো শক্ত অবস্থানে সম্প্রসারিত হচ্ছে, যার বিপরীতে মূল্যস্ফীতিও ঊর্ধ্বমুখী। এই পরিস্থিতিতে নতুন পে-রোল ডেটা ফেডারেল রিজার্ভের পরবর্তী মুদ্রানীতি নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আন্তর্জাতিক বাজারে দামের তীব্র ওঠানামার কারণে এ সপ্তাহে ভারতের বাজারেও স্বর্ণের খুচরা চাহিদা বেশ কম ছিল। ক্রেতারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে আপাতত কেনাকাটা থেকে দূরে আছেন। অন্যদিকে, চীনে স্বর্ণের প্রিমিয়ামের হারও কিছুটা কমেছে।
স্বর্ণের পাশাপাশি বৈশ্বিক বাজারে অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দামও আজ বড় পতনের শিকার হয়েছে। স্পট সিলভার বা রূপার দাম ১ দশমিক ৭ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৭২ দশমিক ৫৮ ডলারে নেমেছে। এছাড়া প্ল্যাটিনামের দাম ১ দশমিক ২ শতাংশ কমে ১ হাজার ৮৭৭ দশমিক ৮২ ডলার এবং প্যালাডিয়ামের দাম ১ শতাংশ কমে ১ হাজার ৩০০ দশমিক ৯০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। স্বর্ণের মতো এই সবকটি ধাতুই চলতি সপ্তাহে সামগ্রিক লোকসানের মুখে পড়েছে।
আরও পড়ুন
- সর্বশেষ খবর
- সর্বাধিক পঠিত
