আদমদীঘিতে সার ডিলারের দোকান মেলে না যথাস্থানে, এক স্থানের সার আরেক স্থানে

মোঃ হারেজুজ্জামান হারেজ, আদমদীঘি (বগুড়া): উপজেলার ৬ ইউনিয়ন ও এক পৌরসভা এলাকার জন্য সারের ডিলার রয়েছে ২৯ জন। এর মধ্যে বিসিআইসি এবং বিএডিসি অনুমোদিত ডিলার ১০ ও শুধু বিএডিসি অনুমোদিত ডিলার ১৯ জন। কৃষক ও খুচরা সার ডিলাররা যাতে করে কম সময় ও খরচ ব্যয় করে তাদের কাছাকাছি পয়েন্ট থেকে সার নিতে পারে সেজন্য এসব ডিলারদের সমন্বয় করে দিয়েছেন একেক ডিলারের লাইসেন্সি এলাকা থেকে অন্য ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকায়। কিন্তু সমন্বয় করা ডিলার যথাস্থানে গেল কি গেল না, দোকান ও গুদামে সার নিয়ে গেল কি গেল না এবং কোন পয়েন্টের সার কোথায় খালাস ও বিক্রি করা হচ্ছে সে খোঁজ খবর উপজেলা কৃষি বিভাগ রাখেন বলে অবস্থা দৃষ্টে মনে হয় না। অতিতের মত অবহেলা বর্তমানেও চলছে অবাধে।
দীর্ঘ দিন ধরে সরেজমিনে অনুসন্ধান করে এসাইন বা সমন্বয় করা একাধিক বিসিআইসি ও বিএডিসি ডিলারকে যথাস্থানে পাওয়া যায়নি। এসাইন মোতাবেক যথাস্থানে না পাওয়া বিসিআইসি ডিলারদের মধ্যে উপজেলার সান্তাহার ইউনিয়নের মেসার্স রফিকুল ইসলাম, এই ডিলারের কোন দোকান ও গুদাম সান্তাহার ইউনিয়ন এলাকায় খুঁজে পাওয়া যায়নি।
খোঁজ নিয়ে দেখা যায় এই ডিলারের দোকান ও গুদাম পরিচালনা করা হয় সান্তাহার পৌরসভা শহরের জেলা পরিষদ ডাকবাংলা সংলগ্ন বাড়ির পাশ থেকে। একই ভাবে মেসার্স ঈসামনি চাউল কল নামক বিসিআইসি অনুমোদিত ডিলারের সমন্বয় পয়েন্ট উপজেলার কুন্দুগ্রাম ইউনিয়নে। কুন্দুগ্রাম ইউনিয়নে এই ডিলারের বিক্রয় পয়েন্ট খুঁজে পাওয়া যায়নি। খোঁজ নিয়ে জানা যায় এই ডিলারের সার দীর্ঘ দিন ধরে খালাস করা হয় উপজেলার চাঁপাপুর ইউনিয়ন সদর বাজারের এক সার ব্যবসায়ীর প্রতিষ্ঠানে। ওই ডিলার তাঁর কুন্দুগ্রাম ইউনিয়নের সার চাঁপাপুর ইউনিয়নে সার খালাস, মজুত ও বিক্রয় করতে পারবে; উপজেলা কৃষি অফিসারের এমন কোন অনুমোদনও সাংবাদিকদের দেখাতে পারেনি ওই দোকান মালিক ওবাদুর রহমান। এই চাঁপাপুর ইউনিয়নে এসাইন ডিলার নসরতপুরের মেসার্স মঙ্গল চন্দ্র সাহা। এই ডিলারের কিছু পরিমাণ সার নামানো হয় চাঁপাপুর বাজারের সোবাহান এন্ড সন্স নামের এক বিএডিসি ডিলারের দোকানে।
বিএডিসি ডিলারের দোকান বিসিআইসি ডিলার ব্যবহার করা বিষয়ে কৃষি অফিসারের লিখিত অনুমোদন দেখাতে পারেনি। সান্তাহার পৌরসভা এলাকায় এসাইন করা বিসিআইসি অনুমোদিত ডিলার মেসার্স মির্জামল বিশ্বেশ্বর লাল। এই ডিলারের সার পৌরসভা সংলগ্ন ছাতিয়ানগ্রাম ইউনিয়নের কামারকুড়ি মৌজা এলাকার একটি চালকলের গুদাম ভাড়া নিয়ে সার খালাস, মজুত ও বিক্রয় কেন্দ্র হিসাবে রাখতে দেখা যায়। সেখানে কোন কৃষককে সার কিনতে যেতে দেখা যায় না বলে জানিয়েছেন ওই চালকলে সব সময় থাকা বাসিন্দারা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সরকার ও সরকারি দলের নেতাদের তৎপরতার কারণে কয়েক বছর পর পৌরসভা শহরে থাকা তার ঘরে সার খালাস, মজুত ও বেচাকেনা করতে দেখা গেছে। কৃষি অফিসার দপ্তরের এসাইন মোতাবেক বিএডিসি ডিলার মেসার্স ইদ্রিস ট্রেডার্সের পয়েন্ট উপজেলার ছাতিয়ানগ্রাম ইউনিয়নের পুর্বঢাকা রোড (পশ্চিম সিংড়া)।
ডিলার ইদ্রিস আলী (একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের কারিগরি শাখার সহকারি শিক্ষক) এক সাক্ষাৎকারে সাংবাদিকদের বলেন, তার নামে ডিলারি লাইসেন্স আছে এটা ঠিক। তবে কখনো ব্যবসা দেখভাল করেননি এবং পুঁজি লগ্নি করেননি। যা করার সব করেন আদমদীঘি উপজেলার সদরের শিয়ালশন এলাকার বিএডিসি ডিলার খন্দকার মাহবুব আলম। মাহবুব আলমের ছেলে খন্দকার জোবায়েরকে ম্যানেজার ও প্রতিনিধি হিসাবে কৃষি অফিসার বরাবরে লিখিত দিয়েছি। এবিষয়ে সচেতন মহলের প্রশ্ন ডিলারি নিজে যখন ব্যবসা করেন না তখন ম্যানেজার ও প্রতিনিধি নিয়োগ করার বিষয়টা কতটা গ্রহনযোগ্য। নসরতপুরের মেসার্স আরাফাত ট্রেডার্সের এসাইন পয়েন্ট উপজেলার চাঁপাপুর ইউনিয়নে। কিন্তু তার সার খালাস করা হচ্ছিল উপজেলার কুন্দুগ্রাম বাজারের বিএডিসির বীজ ডিলার ও কীটনাশক ব্যবসায়ী জয়ন্ত সরকারের দোকানে।
এ সম্পর্কে জয়ন্ত সরকার বলেন, কিছু দিন আমি কৃষি অফিসারকে জানিয়ে সার খালাস ও বিক্রি করেছি। বর্তমানে ডিলার নিজে তার পয়েন্টে সার মজুত ও বিক্রি করছেন। কিন্তু সরেজমিনে চাঁপাপুর বাজারে গিয়ে ওই ডিলারের দোকানের সন্ধান পাওয়া যায়নি। উপজেলা সদরের শিয়াশন ঠিকানার মেসার্স মা ট্রেডার্সের এসাইন পয়েন্ট উপজেলার সান্তাহার ইউনিয়নের ছাতনী বাজারে। ৯ ও ১০ সেপ্টেম্বর পর পর দুই দিন সরেজমিনে গিয়ে সদ্য নেওয়া দোকান ঘর বন্ধ পাওযা যায়।
এসময় সেখানকার ব্যবসায়ী ও কৃষক আবু বক্কর সিদ্দিক, তোফাজ্জল হোসেন, আব্দুল জলিল, আজমল হোসেন ও ইউনুস আলীসহ উপস্থিত প্রায় অর্ধশত কৃষক বলেন, এই বাজারে সারের কোন ডিলার আছে বলে আমাদের জানা নাই। এই ডিলার মাধ্যমে এই বাজারে সার বেচাকেনা করা হয়নি কখনো। ফলে আমরা কখনো ইউনিয়নের সান্দিড়া বাজারের পাপ্পুর দোকান আবার কখনো সান্তাহার শহরের রফিক ডিলারের নিকট থেকে সার কিনে নিয়ে আসি। একই কথা বলেছেন ছাতনি বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম খান।
তিনি জানান, হঠাৎ করে গত মঙ্গলবার ৮ সেপ্টেম্বর বাজারের উত্তর পাশের সর্বশেষে থাকা জনৈক এনামুল হকের দোকানে মেসার্স মা ট্রেডার্স নামক বিএডিসি ডিলারের সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে। দোকানে সার আছে কি না সেটাও বাজারের কেউ জানে না। পক্ষান্তরে মা ট্রেডার্সের মালিক জান্নাতুল ইসলাম সাংবাদিকদের নিকট দাবি করেন তিনি গত এক বছর ধরে ছাতনী বাজারে তার এই দোকানে সার মজুত ও বেচাকেনা করে আসছেন।
এখানে মিথ্যা কে বলছেন কৃষকেরা, বাজার কমিটির সেক্রেটারি না কি ডিলার এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সচেতন মহলে। উপজেলার নসরতপুর বাজারের মেসার্স তুষার ট্রেডার্স নামক বিএডিসি ডিলারের এসাইন পয়েন্ট উপজেলার কুন্দুগ্রাম ইউনিয়নে।
সরেজমিনে কুন্দুগ্রামে এই ডিলারের কোন দোকান খুঁজে পাওয়া যায়নি। সারগুলো কিছু দিন কুন্দুগ্রাম বাজারের জয়ন্ত সরকার নামের এক বীজ ডিলার ও কীটনাশক ব্যবসায়ীর দোকানে সার খালাস, মজুত ও বেচাকেনা করা হচ্ছিল। কিন্তু তার সাথে বনিবনা না হওয়ায় বর্তমানে সারগুলো খালাস, মজুত ও বেচাকেনার পয়েন্ট হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে নসরতপুর ইউনিয়নের মুরইল বাজারের বিএডিসি অনুমোদিত সার ডিলার মেসার্স তাপস ট্রেডার্স নামক দোকানে। তাপস ও তুষার আপন ভাই।
তুষার ট্রেডার্সের মালিক সত্যেন্দ্রনাথ দাস তুষার প্রায় ৮ বছর আগে স্বপরিবারে ভারতের শিলিগুড়িতে চলে গেছেন বলে জানিয়েছেন এলাকার বাসিন্দারা। কিন্তু তার ভাই বিএডিসি সার ও বীজ ডিলার সব্যসাচি দাস তাপস এলাকাবাসির দেওয়া তথ্য সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন। এভাবে সরকারের ভর্তুকির সার নিয়ে অসাধু ডিলার সিন্ডিকেট ও উপজেলা কৃষি অফিসের লুকোচুরির খেলাটি চলে আসছে বছরের পর বছর ধরে।
আরও পড়ুন
- সর্বশেষ খবর
- সর্বাধিক পঠিত
