ন্যায্য মজুরি নির্ধারণে একমত সরকার-মালিক-শ্রমিকপক্ষ, কাজে ফেরার আহ্বান

| আপডেট :  ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৫৭  | প্রকাশিত :  ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৫৭

তৈরি পোশাকশ্রমিকদের চলমান অসন্তোষের মধ্যে নতুন মজুরি নির্ধারণে সরকার, মালিক ও শ্রমিকপক্ষের মধ্যে ঐকমত্য হয়েছে। তিন পক্ষই বলছে, শ্রমিকদের জন্য ন্যায্য ও যৌক্তিক মজুরি নির্ধারণে নতুন মজুরি বোর্ডের ওপর তাদের আস্থা রয়েছে।

ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি ঘোষণা এবং আগামী জানুয়ারি থেকে তা কার্যকরের প্রত্যাশা করছেন তারা।

মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া চলার সময় কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখা বা শিল্পের ক্ষতি হয়, এমন কোনো কর্মসূচি চান না তিন পক্ষের প্রতিনিধিরা।

শ্রমিকদের বৃহস্পতিবার থেকে কাজে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। একইসঙ্গে বন্ধ কারখানা খুলে উৎপাদন স্বাভাবিক করতে মালিকদেরও তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (০৪ নভেম্বর) সচিবালয়ে শ্রম মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে শ্রমিক, মালিক ও সরকারের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ত্রিপক্ষীয় বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তারা। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।

বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রীর শ্রম ও কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, মজুরি বোর্ডের ওপর সরকারের পূর্ণাঙ্গ আস্থা রয়েছে। বোর্ডের সদস্যরা শ্রমিক ও মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে গ্রহণযোগ্য, যৌক্তিক ও ন্যায্য মজুরি নির্ধারণ করবেন। নভেম্বর ও ডিসেম্বরের মধ্যে আলোচনা শেষ করে ডিসেম্বরের ভেতরেই নতুন নিম্নতম মজুরি ঘোষণা করা হবে বলে বোর্ড জানিয়েছে।

মাহদী আমিন বলেন, আগে পাঁচ বছর অন্তর মজুরি বোর্ড গঠন করা হলেও এবার তিন বছর অন্তর নতুন বোর্ড গঠন করা হয়েছে। বোর্ড গঠনের পর দ্রুততম সময়ে প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। দ্বিতীয় সভাও চার দিনের মাথায় আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি সরকারের দ্রুত পদক্ষেপেরই প্রতিফলন।

তিনি বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, এতে শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা হবে, শিল্পের স্বার্থ রক্ষা হবে এবং বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা হবে।

পোশাকশিল্পের স্বার্থে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে মাহদী আমিন বলেন, শ্রমিকদের ত্যাগ ও সংগ্রামের ওপর ভিত্তি করেই ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ স্লোগান বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। তাই এ শিল্পকে এগিয়ে নিতে শ্রমিক, মালিক ও সরকারকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে।

শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বৈঠকে তিন পক্ষের প্রতিনিধিদের মধ্যে যে আন্তরিকতা ও সহযোগিতার মনোভাব দেখা গেছে, তা কারখানাগুলোতেও বজায় থাকা প্রয়োজন। বৃহস্পতিবার থেকে শ্রমিকেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে কাজে ফিরবেন বলে সরকার প্রত্যাশা করে। তবে মজুরি বোর্ডের সঙ্গে সংলাপ, পরামর্শ ও আলোচনা অব্যাহত থাকবে।

পোশাকশিল্পে অস্থিতিশীলতা তৈরির অপচেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ করেন প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা। তিনি বলেন, শান্তিপূর্ণ শ্রমিকদের মধ্যে কিছু বহিরাগত ঢুকে উসকানি দিচ্ছেন এবং উত্তেজনা সৃষ্টি করছেন। বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ঘটছে। এতে সাধারণ শ্রমিকদের রক্ত ঝরছে। এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

কারখানায় কাজে ফেরার আহ্বান শ্রমমন্ত্রীর
শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের জন্য ইতোমধ্যে মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। বোর্ডের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। চার দিনের মাথায় আবারও সভা হবে। অতীতে কোনো দাবি নিষ্পত্তিতে তিন-চার বছর সময় লাগলেও বর্তমান সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছে।

শ্রমিকদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, আপনারা কলকারখানায় কালকে ফিরে যান। আপনাদের সমস্ত দাবি সরকারের পক্ষ থেকে উত্থাপন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে বোর্ড বসেছে, বোর্ডে আলোচনা হবে। আলোচনার ভিত্তিতে সমস্যার সমাধান হবে, ইনশাআল্লাহ।

মন্ত্রী বলেন, শ্রমিকদের দাবি জানানোর নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে। শ্রমিক নেতাদের মাধ্যমে অথবা মন্ত্রণালয়ে লিখিতভাবে দাবি জানাতে হবে। কোনো ধরনের আবেদন বা আলোচনা ছাড়াই রাস্তাঘাট অবরোধ করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

অন্যদিকে যেসব মালিক কারখানা বন্ধ রেখেছেন, তাদের কারখানা খুলে দেওয়ার আহ্বান জানান শ্রমমন্ত্রী। তিনি বলেন, শ্রমিক নেতাদেরও নিজ নিজ কারখানায় গিয়ে শ্রমিকদের কাজে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। শ্রমিকদের নিরাপত্তাসহ সার্বিক সহযোগিতা দেবে সরকার।

মজুরি বাড়ানোর পাশাপাশি রেশন ও আবাসনের দাবি
মালিকপক্ষের প্রতিনিধিরাও নতুন মজুরি নির্ধারণের বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি নির্ধারণে মজুরি বোর্ড গঠনের প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। প্রথম সভায় নতুন মজুরি ঘোষণার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকার, মালিক ও শ্রমিকপক্ষ সম্মিলিতভাবে এ প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে।

মজুরি বোর্ডকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বোর্ডের ওপর আস্থা রাখতে হবে। এতে শিল্প, শ্রমিক ও দেশের অর্থনীতি লাভবান হবে। শ্রমিকদের আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে কারখানায় ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, শ্রমিকদের যৌক্তিক মজুরি বৃদ্ধির দাবির বিষয়ে সরকার, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ কিংবা শ্রমিক প্রতিনিধিদের মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই। সবাই এ দাবির প্রতি সহানুভূতিশীল। মজুরি বোর্ড দ্রুততম সময়ের মধ্যে নতুন মজুরি নির্ধারণ করবে। বোর্ড যে সময়সীমা নির্ধারণ করবে, মালিকপক্ষ সেই সময়ের মধ্যেই তা বাস্তবায়ন করবে।

তবে শুধু মজুরি বাড়িয়ে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার সংকট পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন মোহাম্মদ হাতেম। তিনি বলেন, মজুরি বাড়লে অনেক সময় বাড়িওয়ালারাও বাড়িভাড়া বাড়িয়ে দেন। ফলে শ্রমিকেরা মজুরি বৃদ্ধির প্রকৃত সুফল থেকে বঞ্চিত হন।

এ জন্য শ্রমঘন এলাকাগুলোতে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ, শ্রমিকদের রেশন সুবিধা, বিশেষায়িত হাসপাতাল ও আবাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানান তিনি।

শিল্প ধ্বংস করে নয়, কারখানা চালু রেখেই আন্দোলন
শ্রমিক নেতারাও নতুন মজুরি বোর্ডের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। শ্রমিক নেতা নাজমা আক্তার বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে মজুরি বোর্ড গঠনের মাত্র তিন দিনের মাথায় প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই সভায় ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি ঘোষণা এবং জানুয়ারিতে তা কার্যকরের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ২০২৩ সালে গঠিত মজুরি বোর্ডের প্রথম সভা হতে তিন মাস সময় লেগেছিল।

তিনি বলেন, শ্রমিকদের এখন ফসল ঘরে তোলার সময়। তাই তাদের কারখানায় ফিরে কাজে যোগ দিতে হবে। কোনোভাবেই পোশাক শিল্প ধ্বংস করা যাবে না। কারণ, এ শিল্পের উৎপাদন বিদেশি ক্রয়াদেশের ওপর নির্ভরশীল। সময়মতো পণ্য জাহাজীকরণ করতে না পারলে শিল্পের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে।

শ্রমিকেরা ন্যায়সংগত আন্দোলন করবেন, তবে কোনো ধরনের উসকানি বা বিশৃঙ্খলায় জড়াবেন না বলে প্রত্যাশা করেন তিনি।

আরেক শ্রমিক নেতা মন্টু ঘোষ বলেন, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি জানানোর নির্দিষ্ট পদ্ধতি রয়েছে। আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যে শ্রমিকদের লিখিত দাবি মজুরি বোর্ডের কাছে জমা দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন চলবে, তবে তা কারখানা ও শিল্প ধ্বংস করে নয়। কারখানা চালু রেখেই আলোচনার মাধ্যমে দাবি আদায় করতে হবে।

নিহত শ্রমিকের পরিবারকে এক লাখ টাকা সহায়তা
বৈঠকে সাম্প্রতিক শ্রমিক আন্দোলনে নিহত শ্রমিকের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর বিষয়টিও উঠে আসে। শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে নিহত শ্রমিকের পরিবারকে তাৎক্ষণিকভাবে এক লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের ভিডিও ফুটেজ ও অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে আইনের আওতায় আনা হবে।

এ ছাড়া শ্রমিকদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে গাজীপুরের টঙ্গীতে ১০০ শয্যার একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে হাসপাতাল নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হবে বলেও জানান মন্ত্রী।

আরও পড়ুন


  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত